সম্পাদকীয়

প্রথম জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস: জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা থেকে তারেক রহমানের আধুনিক গ্রাম দর্শন

সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও টেকসই সমৃদ্ধি কখনোই কেবল রাজধানী বা গুটিকয়েক বড় শহরের চাকচিক্যের ওপর নির্ভর করে না। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান ও নদীমাতৃক দেশের ক্ষেত্রে এই সত্যটি আরও বেশি প্রযোজ্য, যেখানে আজ এ দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। এই বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধারণ করে দেশে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬’।

দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া দূরদর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ বাণীটি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘উন্নত পল্লী, সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিযাত্রার এক মৌলিক পথরেখা।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে অত্যন্ত যথার্থই বলেছেন, উন্নত পল্লী ছাড়া কোনোভাবেই একটি আত্মমর্যাদাশীল ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার এই সরকারি প্রত্যয় নতুন বাংলাদেশের রূপান্তরকে আরও গতিশীল করবে।

বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর প্রাতিষ্ঠানিক ও সুদূরপ্রসারী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। ১৯৭৭ সালে তিনি যখন ঐতিহাসিক ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন, তখন মূলত তৃণমূলের অবহেলিত মানুষই ছিল তাঁর মূল চালিকাশক্তি।

কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করা, যুবসমাজকে সুসংগঠিত করা, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং যুগান্তকারী ‘খাল খনন’ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষিতে পানির জোগান নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপগুলো তৎকালীন বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছিল।

বিশেষ করে, তৃণমূল জনগণকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে তাঁর প্রবর্তিত ‘গ্রাম সরকার ব্যবস্থা’ ছিল স্থানীয় শাসনের ইতিহাসে এক অনন্য রাজনৈতিক দর্শন। পরবর্তীতে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও এই গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কৃষি ঋণ মওকুফ ও ক্ষুদ্র ঋণের বিস্তারের মাধ্যমে পল্লী অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল।

আজ দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই গ্রামীণ দর্শনের এক আধুনিক ও ডিজিটাল সংস্করণ আমরা দেখতে পাচ্ছি।

শহীদ জিয়ার ‘১৯ দফা’ ও বেগম জিয়ার ‘কৃষি বান্ধব’ নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান নির্বাচিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬ অনুযায়ী দ্রুত মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে।

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রবর্তিত ‘কৃষক কার্ড’, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘প্রবাসী কার্ড’-এর মতো উদ্যোগগুলো ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে।

একই সাথে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দেশব্যাপী শুরু হওয়া ‘খাল পুনঃখনন’ ও পল্লী অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্পগুলো সরাসরি গ্রামীণ যুব ও নারী সমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পল্লী ভাবনার মূল দর্শন ছিল ‘তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও স্বনির্ভরতা’, আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাবনা হলো ‘পল্লীর আধুনিকায়ন ও ন্যায়ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি’। এই দুই প্রজন্মের চিন্তার মেলবন্ধনই পারে বাংলাদেশকে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে।

তবে এই মহতী লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সকল দপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে।

প্রথম জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রতিটি গ্রামকে শহরের নাগরিক সুবিধাযুক্ত এক একটি আধুনিক উৎপাদনশীল কেন্দ্রে রূপান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শপথ হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা চালুর উদ্যোগ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে নতুন আশার আলো

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা দ্রুত ও স্বচ্ছতার সাথে চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও প্রত্যাশার হিসাব

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বিশেষ প্রতিবেদন। কোটা সংস্কার আন্দোলন, ফারহান ফাইয়াজের শাহাদাত ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশার চালচিত্র।

রক্তস্নাত জুলাইয়ের চেতনা ও বীর ওসমান হাদী: এই বাংলায় পরাজিত ফ্যাসিবাদের ঠাঁই আর হবে না

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো মৌলবাদী আন্দোলন ছিল না। বীর ওসমান হাদীকে হত্যার অপচেষ্টা ও বিদেশে বসে থাকা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হুমকির বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় কলাম।

৩৮ জেলায় নেই আইসিইউ: দেশের ক্রিটিক্যাল কেয়ার সংকটের ভয়াবহ চিত্র ও জরুরি স্বাস্থ্য সংস্কারের তাগিদ

বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের জাতীয় সম্মেলনে দেশে আইসিইউ শয্যা ও চিকিৎসকের তীব্র সংকটের চিত্র তুলে ধরলেন বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান।

নতুন জাতীয় পে-স্কেলের খসড়া গেজেট ও বেতন বৃদ্ধি: আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সুযোগ

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলের খসড়া গেজেটের কাজ শুরু। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির কমিটির সুপারিশে মূল বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির বিস্তারিত রূপরেখা।

প্রধানমন্ত্রীর বাজেট সমাপনী ভাষণ: অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাজেট সমাপনী ভাষণ। তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, তিন ধাপের অর্থনৈতিক কৌশল ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর প্রত্যয়।

তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ: একজন শিক্ষকের মহৎ সংগ্রাম ও পাহাড়ের শিক্ষার নতুন দিগন্ত

বান্দরবান থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। নৌকা চালিয়ে স্কুল টিকিয়ে রাখা প্রধান শিক্ষকের ত্যাগের জয়।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ভাতা: অন্ধকারের অবসান ও ন্যায়বিচারের শুভসূচনা

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য বিশেষ সরকারি ভাতা ও পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গুমের স্থায়ী প্রতিকারে সম্পাদকীয় কলাম।

Search