বিশ্ব

পুতিনের ঘনিষ্ঠ কাদিরভের ক্ষমতার ভিত্তি কতটা শক্ত

আন্তর্জাতিক: রাশিয়ার উত্তর ককেশাসের মুসলিমপ্রধান প্রজাতন্ত্র চেচনিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা রমজান কাদিরভ রুশ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চেচনিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কাদিরভের রাজনৈতিক প্রভাবের পেছনে রয়েছে মস্কোর সমর্থন, স্থানীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর তাঁর শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কাদিরভ পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত চেচনিয়ার আঞ্চলিক নির্বাচনে কাদিরভ পঞ্চমবারের মতো প্রজাতন্ত্রটির প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ৯৯.৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, নির্বাচনটি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে হয়েছে যেখানে কাদিরভের বিরোধীদের রাজনৈতিক পরিসর অত্যন্ত সীমিত বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে।

চেচনিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের সময়। রমজান কাদিরভের বাবা আখমাদ কাদিরভ প্রথমদিকে চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে মস্কোর সঙ্গে সমঝোতা করেন এবং ক্রেমলিন-সমর্থিত প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালে আখমাদ কাদিরভ চেচনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। ২০০৪ সালের মে মাসে এক বোমা হামলায় তিনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে রমজান দ্রুত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন। ২০০৭ সালে ৩০ বছর বয়স পূর্ণ করার পর পুতিনের সমর্থনে তিনি চেচনিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।

এরপর থেকে মস্কো ও গ্রোজনির মধ্যে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে ওঠে। কাদিরভ চেচনিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন দমনে এবং রাশিয়ার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিনিময়ে তিনি প্রজাতন্ত্রটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

কাদিরভের ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা কাঠামো। বিভিন্ন সময়ে তাঁর অনুগত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে।

রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টির ২০০৭ সালের এক প্রতিবেদনে কাদিরভের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে রুশ বিরোধী রাজনীতিক ইলিয়া ইয়াশিনের একটি প্রতিবেদনে কাদিরভের অনুগত বাহিনীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার বলে দাবি করা হয়। তবে এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন এবং বিভিন্ন সময়ের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

রুশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে কাদিরভ-ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা বাহিনীকে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও করেছে। কাদিরভ ও তাঁর প্রশাসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

রমজান কাদিরভের রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর অবস্থানের পরিবর্তন। চেচেন যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তাঁর বাবা আখমাদ কাদিরভ বিচ্ছিন্নতাবাদী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের সময় কাদিরভ পরিবার মস্কোর সঙ্গে সমঝোতায় যায়।

এই পরিবর্তনের পর কাদিরভ পরিবার ক্রেমলিন-সমর্থিত চেচেন প্রশাসনের কেন্দ্রে চলে আসে। আখমাদ কাদিরভের মৃত্যুর পর রমজান কাদিরভ ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও কাদিরভ প্রকাশ্যে পুতিনের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাদিরভ দাবি করেছেন তাঁর বাহিনী ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে অংশ নিচ্ছে।

চেচনিয়ার বাইরে রুশ নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকাণ্ডে কাদিরভ-ঘনিষ্ঠ বাহিনীর ভূমিকা তাঁকে রাশিয়ার বৃহত্তর নিরাপত্তা রাজনীতিতেও পরিচিত করে তুলেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে চেচনিয়ার ক্ষমতায় থাকার কারণে কাদিরভের উত্তরাধিকার নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যরা রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। ফলে কাদিরভ পরিবারের প্রভাব ভবিষ্যতেও চেচনিয়ার রাজনীতিতে কতটা থাকবে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে।

তবে কাদিরভের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা পরিবারের কাউকে আনুষ্ঠানিক উত্তরসূরি করার বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য আলাদা বিষয়। এ ধরনের দাবিকে তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অনুমান হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

২০০৭ সালে চেচনিয়ার নেতৃত্বে আসার প্রায় দুই দশক পরও কাদিরভ ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন। ২০২৬ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনে তাঁর পঞ্চম মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার তথ্য তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।

চেচনিয়ায় কাদিরভের রাজনৈতিক মডেলকে তাই মস্কোর প্রতি আনুগত্য, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কাদিরভ পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয় হিসেবে দেখা যায়। একই সঙ্গে তাঁর শাসনব্যবস্থা নিয়ে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে।

Related News

বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায় ভারত

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী পথে এগিয়ে নিতে চায় ভারত। সব দ্বিপক্ষীয় বিষয় বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন রণধীর জয়সোয়াল।

গ্রিনল্যান্ডে দুটি নতুন ঘাঁটি পাবে যুক্তরাষ্ট্র, নিরাপত্তা চুক্তি সই

যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে সই করেছে। চুক্তিতে দুটি নতুন মার্কিন প্রতিরক্ষা এলাকা, পিটুফিক স্পেস বেস সম্প্রসারণ এবং আর্কটিকে ন্যাটোর ভূমিকা বাড়ানোর বিধান রয়েছে।

নিরাপত্তা শঙ্কা ও জল্পনার মধ্যে নেতানিয়াহুর জাতিসংঘ সফর সংক্ষিপ্ত

জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে জেএফকে বিমানবন্দর এড়িয়ে নিউ জার্সিতে নামতে পারে নেতানিয়াহুর সরকারি উড়োজাহাজ ‘উইং অব জায়ন’। একই সঙ্গে বাতিল হয়েছে ইলন মাস্কের সঙ্গে বৈঠক।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাড়িতে বন্দুক হামলা, অন্তঃসত্ত্বাসহ নিহত ১১

দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়ামাখুথা টাউনশিপে বাড়িতে বন্দুকধারীদের হামলায় অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ১১ জন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। হামলার উদ্দেশ্য এখনো জানা যায়নি।

জাতিসংঘে সিএনএনের সাংবাদিককে ট্রাম্পের ভর্ৎসনা

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কভার করতে গিয়ে সিএনএনের সাংবাদিক কেটলান কলিন্সের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্তপ্ত কথোপকথন হয়েছে। সংবাদমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চলছে আইনি লড়াইও।

ইরানের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরবেন পেজেশকিয়ান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে রওনা হয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের অবস্থান ও অধিকার দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন তিনি।

ফাইবার অপটিক লাইন কেটে যুক্তরাষ্ট্রে শত শত ফ্লাইট বাতিল

নিউ জার্সিতে নির্মাণকাজের সময় গুরুত্বপূর্ণ ফাইবার অপটিক লাইন কেটে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিমান চলাচলে বড় বিঘ্ন ঘটে। প্রায় ৭ হাজার ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মঙ্গলবার যাওয়ার কথা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের।

Search