যশোরে শার্শা সীমান্ত থেকে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার ২৬টি স্বর্ণের বারসহ যুবক গ্রেপ্তার
যশোরের শার্শা সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৩ কেজি ৪৩৮ গ্রাম ওজনের ২৬টি স্বর্ণের বারসহ এক যুবক গ্রেপ্তার হয়েছেন। জব্দ করা স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
বিশ্লেষণ: রিকশা থেকে নেমে চালককে ১০০ টাকার একটি নোট দিয়েছিলেন এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যাত্রী। ফেরত পাওয়ার কথা ৫০ টাকা। রিকশাচালক একটি নোট হাতে দিয়ে জানতে চাইলেন, ‘স্যার, আপনারে কি কেউ ঠকায় না?’
জবাবে ওই যাত্রী রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘কেউ আমাকে ঠকাতে পারে, কিন্তু আমি ঠকি না।’ এমনকি ২০ টাকার নোট দিলেও সেটি তাঁর পকেটে গিয়ে ৫০ টাকা হয়ে যায়—এমন মজার মন্তব্য করে পকেটে থাকা ৫০ টাকার একটি নোট বের করে দেখিয়েছিলেন তিনি।
ঘটনাটি হাস্যরসের হলেও এর আড়ালে রয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—নিজের হাতে থাকা টাকার মূল্য নিজে শনাক্ত করতে না পারার অসহায়ত্ব।
দোকান, রিকশা, বাস কিংবা অন্য যেকোনো নগদ লেনদেনে ফেরত পাওয়া নোটটি নিজে শনাক্ত করতে না পারা একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বড় ধরনের অসুবিধা।
কেউ ভুল করে কিংবা অসততার আশ্রয় নিয়ে কম মূল্যমানের নোট দিলেও তা যাচাই করার সুযোগ অনেক সময় থাকে না। প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নেওয়া অবশ্যই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবার নিজের টাকা চিনতে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনের তথ্য অন্যের কাছে প্রকাশ করা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
এটি কেবল কাউকে অবিশ্বাস করার বিষয় নয়। বরং নিজের উপার্জিত অর্থের মূল্য নিজে শনাক্ত করতে পারা একজন মানুষের মৌলিক আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নোট শনাক্ত করার নানা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। লেখকের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ছোট একটি যন্ত্রের মাধ্যমে নোটের মূল্যমান শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। নোটটি যন্ত্রে প্রবেশ করালে সেটি নির্দিষ্ট মূল্যমান বলে দিতে পারে।
মার্কিন ব্যুরো অব এনগ্রেভিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের ‘আইবিল’ নোট শনাক্তকারী যন্ত্র বিতরণের ব্যবস্থাও রয়েছে। আবার অস্ট্রেলিয়ার ব্যাংকনোটে মূল্যমান শনাক্ত করতে বিভিন্ন দৈর্ঘ্য, স্পর্শচিহ্ন ও বড় সংখ্যার ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে অন্য দেশের ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করলেই বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হবে—এমন নয়। বাংলাদেশের ব্যাংকনোটের নকশা, ব্যবহারকারীদের অভ্যাস এবং প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব সমাধান তৈরি করা প্রয়োজন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য ব্যাংকনোট আরও সহজে শনাক্তযোগ্য করতে মূল্যমানভেদে নোটের আকারে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা যেতে পারে।
স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের জন্য আলাদা রং ও বড়, স্পষ্ট সংখ্যার ব্যবহারও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে টেকসই স্পর্শচিহ্ন রাখা যেতে পারে, যাতে দৃষ্টিনির্ভরতা ছাড়াই নোটের মূল্যমান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
পুরোনো দিনের ধাতব মুদ্রার কিনারা ও খাঁজের মতো স্পর্শভিত্তিক পরিচিতিও এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নোটের মতো স্থায়ী ও সহজে অনুভবযোগ্য স্পর্শচিহ্নের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
নোটের নকশার পাশাপাশি সহায়ক প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই কাজ করবে এবং বাংলায় নোটের মূল্যমান জানিয়ে দেবে—এমন নির্ভরযোগ্য অ্যাপ বা ছোট পকেট ডিভাইস তৈরি করা যেতে পারে।
তবে সমাধানকে কেবল স্মার্টফোননির্ভর করে ফেলা উচিত নয়। কারণ প্রত্যেক মানুষের স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ বা দক্ষতা এক নয়। সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হবে এমন, যেখানে ব্যাংকনোট নিজেই সহজে শনাক্তযোগ্য হবে এবং প্রযুক্তি হবে অতিরিক্ত সহায়তা।
নতুন নোট কিংবা বহুবার হাতবদল হওয়া পুরোনো নোট—উভয় ধরনের নোট দিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে নকশার কার্যকারিতা পরীক্ষা করাও জরুরি।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ১৬ ধারায় প্রবেশগম্যতা, অর্থনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণ ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার মতো অধিকার স্বীকৃত রয়েছে। একইভাবে জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ১২ অনুচ্ছেদে আর্থিক বিষয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
নিজের হাতে থাকা নোটের মূল্য নিজে বুঝতে পারার সুযোগ তাই নিছক একটি সুবিধা নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও সমান অংশগ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক, নোট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে এ বিষয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন ও কর্মপরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষকে যেন নিজের টাকা চেনার জন্য প্রতিবার অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়—এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। ‘আমি ঠকলেও ঠকি না’—এমন রসিকতার আড়ালে থাকা অসহায়ত্ব নয়, বরং নিজের অর্থ নিজে শনাক্ত করার অধিকারই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।