নয়াদিল্লিতে ৮ ও ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ১৬তম সভাটি দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুনরুদ্ধারে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা—স্থলবন্দরভিত্তিক বিধিনিষেধ, অশুল্ক বাধা এবং অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছে।
ভৌগোলিক নৈকট্য থাকা সত্ত্বেও অসম বাণিজ্য নীতি ও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে যে সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি, তা নিরসনে এই বৈঠক প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রসারে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক বাণিজ্যিক নির্ভরতা অনস্বীকার্য। তবে সাফটা চুক্তির সুবিধা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের পদে পদে যে প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়, তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সমতা আনার পথকে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশি পাটপণ্য এবং পেট ফিল্মের ওপর ভারতের আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দেশীয় রপ্তানি খাতের জন্য অন্যতম বড় বাধা।
ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস সনদ প্রাপ্তির জটিলতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের কারণে ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের মানসম্পন্ন পণ্যগুলো প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে। এই আইনি ও কারিগরি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সহজ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। উত্তরণ-পরবর্তী সময়েও ভারতীয় বাজারে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা হলে বাংলাদেশের অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিরবচ্ছিন্ন থাকবে।
যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় ভারতের নিজস্ব স্বার্থের পাশাপাশি বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেরও জোর দাবি জানানো হয়েছে।
ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি ট্রাক প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি করা হলে তা আঞ্চলিক কনেক্টিভিটি বা ‘আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক’-এ বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
ভারতের স্থল কাস্টম স্টেশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, গুদামজাতকরণ, আধুনিক কোয়ারেন্টিন সুবিধা এবং বিআইএস পরীক্ষা কেন্দ্রের অপ্রতুলতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহ, রেল যোগাযোগ উন্নয়ন এবং ভারতীয় তুলার সুতা আমদানির বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের যে দাবি নয়াদিল্লি জানিয়েছে, তা পর্যালোচনার মাধ্যমে উভয় দেশের জন্য একটি ‘উইন-উইন’ বাণিজ্য পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বাণিজ্য সম্পর্ক কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা সুফল পান না। নয়াদিল্লিতে গৃহীত প্রস্তাবনাগুলোকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। সীমান্তে পণ্য খালাসের বাধা দূর, অশুল্ক প্রবিধান নিরসন এবং নেপাল-ভুটান ট্রানজিট নিশ্চিতের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক কনেক্টিভিটিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করাই হোক দুই দেশের বাণিজ্যের মূল লক্ষ্য।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।