বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে (প্রায় ১১,৪৯৮ কোটি ডলার) পৌঁছেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই ঋণের পরিমাণ ৩.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
বিশেষ করে, সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ এক লাফেই ৯০.৯১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৯৫.১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া এবং একই সময়ে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১৯.৮৮ বিলিয়ন ডলারে নামা নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্রীয় প্রবৃদ্ধি ও বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর সরকারের নির্ভরতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে।
বৈদেশিক ঋণের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন আর্থিক সূচক নয়; বরং ডলার সংকট, সুদের হারের চাপ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেগা অবকাঠামো ও বাজেট সহায়তার কিস্তি পরিশোধের মুখে এটি জাতীয় বাজেটের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
এখনি বৈদেশিক ঋণের বেপরোয়া গতিতে লাগাম টানা না গেলে, ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কা বা অন্যান্য ঋণগ্রস্ত উদীয়মান অর্থনীতির মতো কঠিন পরিশোধ সংকটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট বৈদেশিক ঋণের ৮৭.৫২ শতাংশই (১০০.৬৪ বিলিয়ন ডলার) দীর্ঘমেয়াদি এবং ১৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার স্বল্পমেয়াদি ঋণ।
বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৪৮.৯৬ বিলিয়ন ডলার এবং দ্বিপক্ষীয় ঋণের পরিমাণ ৩২.৫৪ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের বাণিজ্যিক ঋণ (১০.৬০ বিলিয়ন ডলার) এবং আইএমএফের ঋণ (৫.৯৭ বিলিয়ন ডলার)-এর উচ্চ সুদের হার সরকারের অর্থায়নের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বৈশ্বিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রতি ডলারের বিপরীতে সরকারকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দেশীয় মুদ্রা খরচ করে ঋণের আসল ও সুদ মেটাতে হচ্ছে, যা জাতীয় বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে।
বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ২০.০২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৯.৮৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসা অর্থনৈতিক মন্দা ও বায়ার্স ক্রেডিটের সংকোচন নির্দেশ করে।
বৈশ্বিক সুদের হার বেশি থাকা এবং দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হারের অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তারা বৈদেশিক ঋণ নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এর ফলে বেসরকারি খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উচ্চ সুদের হার ও কঠিন শর্তযুক্ত বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কেবল দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের রেয়াতী ঋণ গ্রহণের নীতিতে ফিরে আসতে হবে।
যেসব অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক রিটার্ন ধীরগতির, সেগুলোর বাস্তবায়ন গতি কমিয়ে এনে অগ্রাধিকারভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী প্রকল্পে বরাদ্দ স্থানান্তর করা উচিত।
বৈদেশিক ঋণের বিকল্প হিসেবে হুন্ডি প্রতিরোধ করে অফিশিয়াল চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনা এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার আধার বা রিজার্ভ মজবুত করতে হবে।
ঋণের ওপর নির্ভর না করে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণে শুল্ক কাঠামোর সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘ডেব্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ঋণের প্রতিটি খরচের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বৈদেশিক ঋণ নিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার সহজ কৌশল এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ১১৪ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করা এই বিশাল ঋণের বোঝা যদি সুষ্ঠু কৌশলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তবে আগামী প্রজন্মের ওপর এটি এক অসহনীয় দায় হিসেবে চেপে বসবে।
এখন সময় এসেছে সতর্ক হওয়ার এবং ঋণনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও বাজেট শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাবলম্বী অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করার।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।