জুলাই বিপ্লব: ফ্যাসিস্টের পতন ও নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আবির্ভাব।
জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আবির্ভাব নিয়ে চট্টগ্রাম বিএনপির নেত্রী আফরোজা বেগম জলির বিশেষ কলাম।
কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার, ব্যাংকক থেকে | ১৬ অক্টোবর ২০২৬
IMF and World Bank Group এর আমন্ত্রণে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে তাদের বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেছি। গত দুইদিন নানা রকম ইভেন্টে ব্যস্ত দিন পার করেছি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাথে ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করার সুযোগ হয়েছে। মরক্কোর অর্থমন্ত্রী, উগান্ডার ফাইন্যান্স সেক্রেটারি, জাপানি ও ভারতের প্রতিনিধিদের সাথে ফটোসেশন করার সুযোগ হয়েছে। সম্মেলনের সবগুলো ইভেন্ট চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সম্মেলন চলবে।
এবারের সম্মেলনের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে ব্যাংককের ঐতিহাসিক কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে – “Thailand’s New Horizons: Empowering People, Building Resilience”। অর্থাৎ নতুন দিগন্তের পথে থাইল্যান্ড, মানুষকে ক্ষমতায়ন এবং সহনশীলতা গড়ে তোলা। এই থিমটি শুধু থাইল্যান্ডের জন্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এখন প্রাসঙ্গিক।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল প্লেনারি সেশন উদ্বোধন করেছেন থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল। তাঁর বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেছেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব, অন্যদিকে ঋণ সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অবস্থায় শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন সহনশীলতা।
এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বিশ্বব্যাংকের নতুন কৌশল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাংক তার জলবায়ু অর্থায়ন ৪৫ শতাংশে উন্নীত করবে এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেলস খাতে অর্থায়ন পাঁচগুণ বাড়িয়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে সবুজ অর্থনীতি, এবং সেই অর্থনীতির জ্বালানি হবে এই খনিজ সম্পদ। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
অন্যদিকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ এবং IMF এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফায়ারসাইড আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ওয়ার্শ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি পজিটিভ সাপ্লাই শক হিসেবে কাজ করবে। এটি উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। তবে এর সুফল পেতে হলে দেশগুলোকে প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে।
এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে, যা এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের জন্য এবারের সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে IMF এর কাছে নতুন করে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চেয়েছে। এই ঋণ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয়টি কিস্তিতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি IMF এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সাথে বৈঠক করেছেন। বৈঠকটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই এই ঋণ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু এই ঋণের পেছনে একটি বড় বার্তা আছে, যা সম্মেলনের মূল সুর – Reform First, Money Later। অর্থাৎ আগে সংস্কার, তারপর অর্থ। IMF এবং বিশ্বব্যাংক উভয়ই স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত, কিন্তু বাংলাদেশকে তার নিজের ঘর গোছাতে হবে।
সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো কী কী? প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব খাতের সংস্কার। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি বাড়াতে হবে, করের আওতা বাড়াতে হবে এবং কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে যেতে হবে।
আমি মনে করি, এই শর্তগুলোকে বোঝা হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ এই সংস্কারগুলো বাংলাদেশের নিজের স্বার্থেই প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, একটি স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থা এবং একটি টেকসই জ্বালানি নীতি ছাড়া বাংলাদেশ কখনোই উন্নত দেশের কাতারে যেতে পারবে না। বিশ্বব্যাংক এবং IMF এর এই চাপকে আমরা যদি ইতিবাচকভাবে নিই, তবে এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে – বিশ্ব এখন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্ব সম্প্রদায় নতুন করে বাংলাদেশকে দেখতে চায়। তারা বিনিয়োগ করতে চায়, সহায়তা করতে চায়। কিন্তু তারা একটি স্থিতিশীল, সংস্কারমুখী এবং স্বচ্ছ বাংলাদেশ দেখতে চায়। ব্যাংককের এই সম্মেলন সেই বার্তাই দিচ্ছে।
আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত এই সম্মেলন চলবে। আমি আশা করি, এই সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা আসবে। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে, সংস্কারের মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলবে। কারণ বিশ্ব দরজা খুলে রেখেছে, এখন সিদ্ধান্ত আমাদের। লেখক : রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক