সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৬-দফা কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল একটি সাধারণ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ আর নেই। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক কাঠামো, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ৬ থেকে ১১টি সশস্ত্র গ্রুপের সক্রিয়তা, ক্রমবর্ধমান মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে এক গভীর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে এবং ‘মানবিক দায়বদ্ধতা, জাতীয় স্বার্থ ও নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা’র সমন্বয়ে যে নতুন অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।

রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে স্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পর এখন আরাকান আর্মির কঠোর মনোভাবের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনৈতিক পদক্ষেপে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে প্রথম দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সফল হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির দ্বৈত অবস্থান এবং সাম্প্রতিককালে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাইকরণের ঘোষণা মূলত আন্তর্জাতিক আদালতের চাপ কমানোর একটি কৌশলমাত্র। ফলে বাংলাদেশ সরকারকে কেবল মিয়ানমার সরকারের ওপর নির্ভর না করে আরাকান আর্মির সাথেও পৃথক যোগাযোগ ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকটকে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে সমাধানের জন্য সরকারের ঘোষিত ৬-দফা রূপরেখা একটি বাস্তবসম্মত গাইডলাইন প্রদান করে।

জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি এবং আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

বেইজিং ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সমর্থন অর্জনের পাশাপাশি মিয়ানমার সরকার ও অ-রাষ্ট্রীয় সক্রিয় পক্ষ (আরাকান আর্মি)—উভয়ের সাথেই গতিশীল তথ্য প্রবাহ ও যোগাযোগ বজায় রাখা।

ক্যাম্পগুলোতে অপরাধীদের তৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করা এবং পূর্ব সীমান্তে দেশের বিশ্বাসযোগ্য সামরিক ও সীমান্ত প্রতিরোধ সক্ষমতা সুসংহত করা।

আসিয়ান ও ওআইসিকে এক ছাতার নিচে এনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি বিশেষ আঞ্চলিক সংলাপ কাঠামো গঠন করা।

রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৈরি করা দায় হলেও এর খেসারত সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। কেবল ত্রাণের আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অতীতের সফল পররাষ্ট্রনীতির আলোকে এবং বর্তমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সমীকরণ বজায় রেখে মিয়ানমারের ভেতরে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও নাগরিকত্বসহ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ঘোষিত ৬-দফা কৌশলের দ্রুত ও নিখুঁত বাস্তবায়নই আমাদের একমাত্র পথ।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search