বিশ্ব

নেপালের ‘কিডনি ভ্যালি’র ক্ষত, সীমান্ত পেরিয়ে নতুন অঙ্গ পাচারের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক: কিডনি শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যা হারালে আর ফিরে আসে না—কিন্তু নেপালের হোকসে গ্রামের দরিদ্র মানুষকে একসময় বোঝানো হয়েছিল ঠিক উল্টো কথা। দালালদের কেউ কেউ তাদের বলেছিল, কিডনি কেটে ফেললেও সেটি আবার গজিয়ে উঠবে। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এমন প্রতারণার মাধ্যমে বহু মানুষকে কিডনি বিক্রিতে রাজি করানো হয়। এ কারণে একসময় হোকসে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে পরিচিতি পায়।

পুরোনো সেই অধ্যায় অনেকটা স্তিমিত হলেও এর ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। কিডনি অপসারণের পর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা, কর্মক্ষমতা হারানো এবং আর্থিক দুর্দশার সঙ্গে লড়ছেন অনেক ভুক্তভোগী। এর মধ্যেই নতুন ধরনের অঙ্গ পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে—এবার লক্ষ্য নেপালের দরিদ্র ও বেকার যুবকেরা, আর পাচারের অন্যতম পথ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে নেপাল-ভারত সীমান্তকে।

নেপালের কাভ্রেপালাঞ্চক জেলার হোকসে ও আশপাশের এলাকায় কয়েক দশক ধরে কিডনি বিক্রির ঘটনা আলোচনায় এসেছে। অর্থনৈতিক সংকটের সুযোগ নিয়ে দালালরা স্থানীয়দের অর্থের প্রলোভন দেখাত। কাউকে চাকরি বা দ্রুত আর্থিক লাভের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো, আবার কারও কাছে কিডনি অপসারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি গোপন করা হতো।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ প্রতারণার কথা। কিডনি অপসারণের পর শরীর স্বাভাবিকভাবেই তা পূরণ করে নেবে—এমন মিথ্যা আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

অস্ত্রোপচারের পর অনেকেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন। কেউ কেউ আগের মতো ভারী কাজ করতে পারছেন না। ফলে কিডনি বিক্রি করে সাময়িক অর্থ পাওয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের জীবনে নেমে এসেছে আরও বড় সংকট।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কেবল হোকসে নয়—আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও একইভাবে দরিদ্র মানুষকে কিডনি বিক্রিতে প্ররোচিত করা হয়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি অবৈধ অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হোকসের পুরোনো ঘটনা থেকে নেপালের অঙ্গ পাচারের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়নি। বরং দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে পাচারকারীরা নতুন কৌশল ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে নেপালি শ্রমিকদের কিডনি-সংক্রান্ত সংকটের বিষয়টি উঠে আসে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কঠিন কর্মপরিবেশ, প্রচণ্ড গরম ও পানিশূন্যতার কারণে অনেক নেপালি শ্রমিক কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরছেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি (CESLAM)-এর গবেষণায় নেপাল-ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে অঙ্গ পাচারের নতুন অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দরিদ্র ও বেকার যুবকদের ভারতে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রেখে জোরপূর্বক কিডনি অপসারণের অভিযোগ রয়েছে।

এমনই এক ঘটনার অভিযোগ করেছেন নেপালের সিন্ধুলি জেলার এক ব্যক্তি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে ভারতে নেওয়া হয়। সেখানে একটি অ্যাপার্টমেন্টে প্রায় এক মাস আটকে রাখার পর তাঁর একটি কিডনি অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়।

তিনি এতে রাজি না হওয়ায় জোর করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে অচেতন করে বাম কিডনি অপসারণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন। তাঁর সঙ্গে ৬ লাখ ভারতীয় রুপির বিনিময়ে কিডনি নেওয়ার চুক্তি করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন। কিন্তু দেশে ফেরানোর সময় তাঁকে দেওয়া হয় মাত্র ১০ হাজার রুপি।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নেপালে ফিরে ওই ব্যক্তি পরিবারের কাছে পুরো ঘটনা জানান। পরে তিনি নেপালের অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AHTIB)-এ অভিযোগ করেন।

ঘটনাটির স্বাধীন তদন্ত ও অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া পুরো বিষয়টিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলা যায় না। তবে এ ধরনের অভিযোগ নেপালে মানব পাচার ও অঙ্গ পাচারের আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হোকসের ‘কিডনি ভ্যালি’ এখন অনেকটাই অতীতের প্রতীক। স্থানীয়দের একটি অংশ সেই পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের জনপদের নতুন পরিচয় গড়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিডনি বিক্রির পুরোনো ক্ষত এখনো অনেক পরিবারের জীবনে দৃশ্যমান।

একই সময়ে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং বিদেশে চাকরির আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে অঙ্গ পাচারের অভিযোগ সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

নেপালের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, অঙ্গ পাচার ঠেকাতে শুধু অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান যথেষ্ট নয়। বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা, মানব পাচার এবং সীমান্তপারের অপরাধ—সবকিছুর বিরুদ্ধে সমন্বিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সচেতনতা ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

Related News

স্বামী ঘুরতে নিয়ে যান না, বিচ্ছেদের আবেদন শারজাহর নারীর

অবসরে স্বামী তাকে বাইরে ঘুরতে বা বেড়াতে নিয়ে যেতে আগ্রহী নন—এমন অভিযোগে শারজাহর এক নারী বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। পারিবারিক পরামর্শ বিভাগ তাকে সমঝোতার পরামর্শ দিয়েছে।

স্থল হামলা হলে মার্কিন ঘাঁটি জাহাজে হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজগুলোতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইআরজিসির উপদেষ্টা আলী ফাদাভি। হরমুজ প্রণালি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের জমি দখল করে বন্দিশিবির নির্মাণের অভিযোগ আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস, জমি দখল, জোরপূর্বক শ্রম ও বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান ও জাতিসংঘের তথ্যেও এসব অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।

আবাসন সংকটের মধ্যে ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচন স্পেনে

আবাসন সংকট ও পার্লামেন্টে সরকারের সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর ২৯ নভেম্বর আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।

সংঘাতের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি ছাড়াল যুদ্ধপূর্ব পর্যায়

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা সত্ত্বেও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী অঞ্চলটি থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়কে ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংবাদ।

ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযানের ঘোষণা সরকার

হুতি বিদ্রোহীদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেন সরকার। এদিকে রিয়াদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার দাবি করেছে হুতিরা। আন্তর্জাতিক সংবাদ।

অপটোজেনেটিকস আবিষ্কারে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন ৩ বিজ্ঞানী

আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিকস আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল। আন্তর্জাতিক সংবাদ।

ভারতের উত্তর প্রদেশে শহীদ সেনাসদস্যের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনা

: উত্তর প্রদেশে শহীদ সেনাসদস্যের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় পড়ে সেনাসদস্যের ছেলে, ভাই ও ভাতিজাসহ চারজন নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ।

Search