“আমরা প্রকৃতিকে রক্ষা করছি না, আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করছি। প্রকৃতি ছাড়া আমরা কিছুই নই।
জলবায়ু পরিবর্তন শব্দটি আজ আর কোনো একাডেমিক পরিভাষা বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক রক্তাক্ত দলিল। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর কারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে সুন্দরবনের খেটে খাওয়া জেলেকে, সাতক্ষীরার লবণাক্ত মাঠের কৃষককে এবং ভিটেমাটি হারানো ভোলার জলবায়ু উদ্বাস্তুকে।
গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের সপ্তম শীর্ষ দেশ বাংলাদেশ অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আমাদের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক চার সাত শতাংশ (০.৪৭%)। এই নির্মম বৈপরীত্যই হলো বৈশ্বিক জলবায়ু অবিচারের সবচেয়ে বড় ও নিষ্ঠুর উদাহরণ।
কেন উত্তপ্ত হচ্ছে আমাদের পৃথিবী?
এর নেপথ্যে রয়েছে মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস প্রভাব। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে অবাধ শিল্পায়ন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধিতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রাচীনকালের ২৮০ পিপিএম (ppm) থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪২৩ পিপিএম ছাড়িয়েছে। এই অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে আটকে থাকার ফলে গত দেড় শ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলস্বরূপ—মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের অম্লতা বাড়ছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রতি বছর গড়ে ৩ দশমিক ৩ মিলিমিটার করে উপরে উঠে গ্রাস করছে উপকূলীয় জনপদ।
বাংলাদেশের জন্য তিনটি মৃত্যুফাঁদ
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তিনটি সর্বগ্রাসী মৃত্যুফাঁদের:
১. তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা: ইন্টারনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ প্রতিবেদন অনুযায়ী, একুশ শতকের শেষ নাগাদ (২১০০ সাল) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি স্থায়ীভাবে পানির নিচে তলিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, তখন ৩ কোটিরও বেশি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে এবং মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন।
২. লবণাক্ততার নীরব আগ্রাসন: উপকূলীয় অঞ্চলে এখন আর মিষ্টি পানির অভাবের পাশাপাশি আশানুরূপ ফসল ফলে না; ফসলি মাঠ গ্রাস করেছে লোনাপানি। গত দুই দশকে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে মিঠা পানির স্তর ৩ মিটার নিচে নেমে গেছে। এমনকি সুন্দরবনের ৭০ শতাংশ এলাকায় লবণাক্ততা সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্বও আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
৩. দুর্যোগের দুষ্টচক্র: অতীতে যেখানে দীর্ঘ ব্যবধানে বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানত, সেখানে এখন প্রতি ২-৩ বছর পরপর আঘাত হানছে প্রলয়ঙ্করী সুপার সাইক্লোন। সিডর (২০০৭) থেকে শুরু করে মোখা (২০২৩)—প্রতিটি ঝড়ই তার পূর্বসূরির তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়মিত ও আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং প্রাণঘাতী তাপদাহ।
উত্তরণের পথ: অভিযোজন ও প্রতিরোধ
এই সর্বনাশা সংকট থেকে রক্ষা পেতে আমাদের কৌশল হতে হবে দ্বিমুখী ও সুদূরপ্রসারী—
বৈশ্বিক দরকষাকষি: আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে (COP) বাংলাদেশকে কেবল সাহায্য বা অনুদানের দাবি থেকে সরে এসে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণের দাবিতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। উন্নত বিশ্বকে তাদের প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দ্রুত বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে।
স্থানীয় টেকসই বিপ্লব:
জ্বালানি রূপান্তর: জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জোয়ার-ভাটার শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
উপকূলীয় অভিযোজন: প্রয়োজনীয় সংখ্যক মুজিব কিল্লা নির্মাণ, লবণ সহিষ্ণু ধানের জাত (যেমন: ব্রি-৬৭) উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, ভাসমান কৃষি এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সবুজ অর্থনীতি: তরুণ প্রজন্মের জন্য ‘গ্রিন জব’ বা সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ কঠোরহস্তে রোধ এবং দেশের অন্তত ২০ শতাংশ ভূমিতে বৃক্ষাচ্ছাদন নিশ্চিত করতে হবে।
সচেতনতার বাতিঘর: ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তুলতে জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে জলবায়ু শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। কারণ, একজন পরিবেশসচেতন নাগরিকই পারে রাষ্ট্রকে সঠিক পথ দেখাতে।
শেষ কথা:
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের ভবিষ্যৎ নয়, এটি আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা নির্মম বর্তমান। আজ যদি আমরা সম্মিলিতভাবে ঘুরে না দাঁড়াই, তবে ইতিহাস আমাদের কখনো ক্ষমা করবে না। পৃথিবীটা আমাদের পূর্বপুরুষদের কোনো দান নয়, এটি আমাদের সন্তানদের কাছে আমাদের পবিত্র ঋণ। সেই ঋণ পরিশোধের শ্রেষ্ঠ সময় এখনই।
লিখেছেন: আফরাজুর রহমান লিমন