ধর্ম

মনোযোগহীন বা প্রাণহীন নামাজের চেয়ে কি নামাজ একেবারে ছেড়ে দেওয়াই ভালো?

ইসলাম ও জীবন: নামাজে দাঁড়ালেই অনেক সময় মনে হয়, আমরা কেবল যান্ত্রিকভাবে রুকু-সেজদা করে যাচ্ছি; অন্তরে কোনো ভাব নেই, ভক্তি নেই, এমনকি কী পড়ছি তারও কোনো খবর থাকে না। এই যান্ত্রিকতা ও একাগ্রতার অভাবে অনেকের মনে হতাশার জন্ম নেয় এবং আত্মগ্লানিতে ভুগে একপর্যায়ে তাঁরা নামাজ ছেড়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মনোযোগহীন বা প্রাণহীন নামাজের চেয়ে কি নামাজ একেবারে ছেড়ে দেওয়াই ভালো? উত্তর হলো—না, শতভাগ মনোযোগহীন একটি নামাজও নামাজ ত্যাগ করার চেয়ে কোটি গুণ উত্তম।

নামাজে একাগ্রতা না পেলে শয়তান মানুষের মনে সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক বিভ্রান্তি তৈরি করে। সে প্ররোচনা দেয় যে—যে নামাজে আল্লাহর প্রতি প্রেম ও মনোযোগ নেই, সেই লোকদেখানো ইবাদত করে কী লাভ? এর চেয়ে বরং মন পবিত্র হলে তখন নামাজ পড়া উচিত। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিকে খুব আন্তরিক মনে হলেও এটি শয়তানের একটি মরণফাঁদ। শয়তান ভালো করেই জানে, বান্দা যান্ত্রিকভাবে হলেও যতক্ষণ জায়নামাজে সেজদা দিচ্ছে, সে আল্লাহর আনুগত্যের গণ্ডির মধ্যেই আছে। কিন্তু একবার নামাজ ছেড়ে দিলে সে পুরোপুরি আল্লাহর রহমতের সীমানা থেকে ছিটকে পড়বে।

ইসলামে নামাজ আদায়ের দুটি দিক রয়েছে—একটি হলো ফরজ বিধান পালনের মাধ্যমে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া, অন্যটি অন্তরের একাগ্রতার মাধ্যমে সওয়াব ও আত্মিক উন্নতি লাভ করা। একজন মুমিন যখন রুকু, সেজদা ও কেরাতসহ মৌলিক রুকনগুলো যথানিয়মে আদায় করে, তখন তার ওপর থেকে ফরজ ত্যাগের পাপের বোঝা নেমে যায় এবং সে ‘বেনামাজি’ বা পরিত্যাগকারীর তালিকা থেকে মুক্ত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “একজন ব্যক্তি এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ পরিত্যাগ করা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮২)

নামাজে যতটুকু মনোযোগ থাকে, বান্দা ঠিক ততটুকুই সওয়াব পায়। সুনানে আবু দাউদের (হাদিস: ৭৯৬) একটি হাদিসে এসেছে, নামাজ শেষে বান্দার আমলনামায় তার একাগ্রতা অনুযায়ী দশভাগের একভাগ থেকে শুরু করে অর্ধেক পর্যন্ত সওয়াব লেখা হয়। নবীজি (সা.) বলেননি যে মন না থাকলে নামাজ বাতিল হয়ে যাবে। সুতরাং, সামান্য সওয়াব পাওয়াও তো একেবারেই শূন্য থাকার চেয়ে হাজার গুণ শ্রেয়!

নবীজি (সা.) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে বাড়ির সামনের প্রবাহিত স্বচ্ছ নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করলে শরীরে কোনো ময়লা থাকে না (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮)। ঠিক তেমনি, মনোযোগ কম থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন নিয়মিত অজু করে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো পাপ মোচনের কারণ হয় এবং মানুষকে বড় বড় অনৈতিক কাজ থেকে বিরত রাখে। ক্ষুধামন্দায় ভোগা রোগী যেমন স্বাদ না পেলেও বেঁচে থাকার তাগিদে জোর করে খায় এবং একসময় সুস্থতা ফিরে পায়, তেমনি মন না বসলেও নামাজ আঁকড়ে ধরে রাখলে হৃদয়ে স্বর্গীয় একাগ্রতা ও প্রশান্তি ফিরে আসে।

ইসলামি মনীষী ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দরজায় অবিচলভাবে কড়া নাড়তে থাকে, একদিন না একদিন তার জন্য সেই দুয়ার উন্মুক্ত হবেই। নামাজ হলো সেই রাজকীয় দরজায় ভিখারির মতো হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকা।

সংক্ষেপে বলা যায়, মনোযোগহীনতার অজুহাতে নামাজ ছেড়ে দেওয়া কোনো ধার্মিকতা নয়, বরং এটি শয়তানের ফাঁদ। মন খারাপ থাকুক কিংবা কাজে চাপ থাকুক, কখনো জায়নামাজ ও আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকার এই শেষ রশিটি ছিঁড়ে ফেলা যাবে না।

Related News

ইসলাম কি কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান? ‘হাদিসে জিবরাইল’-এর আলোকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার রূপরেখা

হাদিসে জিবরাইলের আলোকে ইসলাম, ইমান ও ইহসানের ব্যাখ্যা এবং এটি কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা তা নিয়ে বিস্তারিত ফিচার। ইসলাম ও জীবন পাতা।

নিরাপদ সড়ক ও চলাচলের নৈতিকতা ইসলাম কী শিক্ষা দেয়?

রাস্তায় চলাচলের শিষ্টাচার, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং নিরাপদ সড়ক গঠনে ইসলাম কী শিক্ষা দেয়, তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন। ইসলাম ও জীবন।

দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুদান, মিলছে টানা ৫ দিনের ছুটি

শারদীয় দুর্গোৎসব ও বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসবে বরাদ্দ বাড়ালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পূজা উপলক্ষে সরকারি চাকরিজীবীরা পাচ্ছেন টানা ৫ দিনের ছুটি। বিস্তারিত পড়ুন ডেইলি শব্দমিছিলে।

পরিবার নিয়ে ঘরোয়াভাবে জন্মদিন পালন, ইসলাম কী বলে?

পরিবার নিয়ে ঘরোয়াভাবে জন্মদিন পালন, কেক কাটা ও মোমবাতি জ্বালানোর বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী? জন্মদিনে রোজা, দোয়া, ইবাদত ও দান-সদকা নিয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা।

এআই ডেভেলপমেন্টের কাজ কি বৈধ? যা বললেন মুফতি সাইদুজ্জামান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা বা এআই ডেভেলপমেন্টের পেশা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না—এ বিষয়ে মুফতি সাইদুজ্জামান কাসেমির ব্যাখ্যা।

কনের সম্মতি ছাড়া কাবিননামায় মোহর কম লেখা যাবে?

নির্ধারিত মোহর কাবিননামায় কম করে লেখা যাবে কি না এবং কীভাবে কমানো যাবে—এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান জানিয়েছেন মুফতি ও মুহাদ্দিস জাওয়াদ তাহের।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর শেষ হচ্ছে ২০২৭ সালের হজের নিবন্ধন, সময় আর বাড়ছে না: ধর্ম মন্ত্রণালয়

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৭ সালের হজের নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হবে। আর সময় বাড়ানো হবে না জানিয়ে দ্রুত নিবন্ধনের তাগিদ দিল ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

হেদায়েত লাভ ও তা ধরে রাখার উপায়

হেদায়েত আল্লাহর এক বিশেষ দান। কোরআনের আলোকে হেদায়েত লাভ এবং তার ওপর অবিচল থাকার কার্যকরী উপায়সমূহ নিয়ে বিশেষ জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিবেদন।

Search