সার্ক কার্যকর করতে বাংলাদেশ-নেপাল একমত
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে (সার্ক) পুনরায় সক্রিয় ও কার্যকর করার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও ঢাকায়…
সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার অসাধু দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক। প্রকাশিত গবেষণায় দেশের ৮টি প্রশাসনিক বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। এছাড়া ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান ও পেশাগত চর্চা বিষয়ে জরিপ পরিচালনার পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী ও রোগীসহ ৩২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক বাজেট ব্যবহারের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল সবচেয়ে কম—মাত্র ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এই আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়ার দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো। যেমন- পাঁচ বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার ট্রানজেকশনের অভিজ্ঞতা চাওয়া হতো। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া কয়জন ব্যবসায়ী এই শর্ত পূরণ করতে পারবে? মূলত প্রতিযোগিতা সীমিত করে নিজেদের লোকজনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্যই এসব করা হতো।
স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটার নামে সরকারি অর্থ অপচয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১১ কোটি টাকার একটি রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা দিয়ে দু’টি কেনা হয়েছিল। কিন্তু যেসব হাসপাতালে মেশিনগুলো বসানো হয়েছে, সেখানে কোনো প্রস্তুতিই (রেডি সেটআপ) ছিল না। কেন কেনা হয়েছিল? কারণ প্রতি মেশিনে ৪ থেকে ৬ কোটি টাকা লাভ ছিল। বর্তমানে যার একটি পড়ে আছে ফরিদপুরে, অন্যটি খুলনায়। একইভাবে পর্যাপ্ত কারিগরি লোকবল ছাড়াই এক্স-রেসহ অন্যান্য টেকনোলজির সরঞ্জাম কিনে ফেলে রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
হাসপাতাল কেন্দ্রিক টেস্ট বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব না পালন করে পাশের ক্লিনিকে গিয়ে সার্জারি করা, কমিশন খাওয়া এবং রোগীদের বাইরের ক্লিনিকে গিয়ে টেস্ট করানোর প্রবণতা বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি চালু করা হচ্ছে।
বিগত সরকারের স্বাস্থ্য নীতির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, গত চার বছর ধরে যে হামের টিকা দেওয়ার কথা ছিল, তা সংগ্রহ করা হয়নি এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর কোনো ক্যাম্পেইনও হয়নি। ইউনিসেফের অনুরোধ সত্ত্বেও টিকা কেনা হয়নি। ফলে বর্তমানে যে শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের ৯৯ শতাংশই আনভ্যাক্সিনেটেড। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই টিকাদান কর্মসূচি বেগবান করেছে এবং সম্প্রতি আরও ১ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস সেবা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকে একটি বিদেশি কোম্পানি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডায়ালাইসিসের বাজার দখল করে রেখেছিল। আগামী নভেম্বরে তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। সরকার এখন নিজস্ব উৎস থেকে ডায়ালাইসিস মেশিন কিনবে। ফলে ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে এবং সাধারণ মানুষ অত্যন্ত কম খরচে সেবা পাবে। পাশাপাশি প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু করা হচ্ছে।
দেশের সাধারণ মানুষ ও নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় তিন মাসের মধ্যে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং এআই সমৃদ্ধ ‘কিট বক্স’ দেওয়া হবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে উচ্চতা, ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং লিপিড প্রোফাইল, আরবিসি ও সিবিসি পরীক্ষা করবেন। পুরুষদের কাছে পুরুষকর্মী এবং নারীদের কাছে নারী স্বাস্থ্যকর্মী যাবেন।
মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, অডিটের নামে এক টাকাও ঘুষ দেওয়া যাবে না। সৎ থাকলে কাউকেই ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, “আমাকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না, জেলেও নিতে পারবে না। আপনি যদি সৎ হন, তবে অডিটে অনৈতিক টাকা চাওয়া বন্ধ করুন এবং সরাসরি আমার কাছে আসুন। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আমি নিজে তা ফেস করব।”
হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গর্ভবতী মা এলে পরিবারকে অহেতুক ভয় দেখিয়ে সিজারিয়ান অপারেশনে বাধ্য করার প্রতারণামূলক ব্যবসা বন্ধে সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে অভিযান শুরু হয়েছে। লেবার রুম বা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ছাড়া পরিচালিত ক্লিনিকগুলো ইতিমধ্যেই বন্ধ করা শুরু হয়েছে এবং এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা উপস্থিত ছিলেন।