অবশেষে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ফিজিক্স টেস্ট বা পারমাণবিক চুল্লির পরীক্ষামূলক সূচনা সম্পন্ন হয়েছে। আজ ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে এই খবরটি নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই একটি খবরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আগামী ৫০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতার গল্প।
এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান সক্ষমতার সবচেয়ে বড় সনদ। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে প্রথম রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তব হতে সময় লেগেছে ৬৫ বছর। স্বাধীনতার পর এই প্রকল্প নানা ষড়যন্ত্রে আটকে যায়। আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময়ে এসে এর প্রথম ইউনিট আলো ছড়াতে প্রস্তুত। ২৪০০ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রটি যখন পুরোপুরি চালু হবে, তখন দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ আসবে এই একটি কেন্দ্র থেকেই।
এর গুরুত্ব কেন এত বেশি? কারণ বাংলাদেশ আজ এক কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আজই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি, ফলে দেশে ‘নতুন গরিব’ শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ২২.৫ শতাংশ হতে পারে। ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ একটিমাত্র অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। এর মূল কারণ হলো জ্বালানি খাতে আমাদের দুর্বলতা। আমরা গ্যাস, তেল এবং কয়লা আমদানির উপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই আমাদের রিজার্ভে টান পড়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়ে, আর সেই চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের উপর।
রূপপুর সেই নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তির পথ। পারমাণবিক বিদ্যুৎ একবার চালু হলে ৬০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন, সস্তা এবং কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ দেবে। এটি আমাদের শিল্পায়নের জন্য সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি। গাজীপুরে আজ দুটি গার্মেন্টস কারখানায় আগুন লেগেছে, বেনাপোলে সার্ভার জটিলতায় বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে, খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে — এই সব সংকটের পেছনে একটি সাধারণ যোগসূত্র হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও স্থিতিশীলতা। রূপপুর সেই স্থিতিশীলতার নাম।
এই অর্জনের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এই সফরে জাইকা, জেট্রো এবং জেবিআইসির সাথে বড় বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে। জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী। জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে চায়, কিন্তু তাদের প্রথম প্রশ্ন — আপনাদের কি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আছে? রূপপুরের এই সফলতা সেই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় জবাব।
একই সাথে, ভারতের সাথে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের আলোচনা চলছে, যা ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর এবং জাপান সফর — দুটোই প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন আর সাহায্য চাওয়া দেশ নয়, বরং দর কষাকষি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর এই সক্ষমতার পেছনে রূপপুরের মতো মেগা প্রকল্পগুলো শক্তি যোগাচ্ছে।
তবে এখানেই শেষ নয়, শুরু। পারমাণবিক বিদ্যুৎ মানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। বিশ্বের দিকে তাকালে দেখি, চেরনোবিল ও ফুকুশিমার দুর্ঘটনা আমাদের শেখায় এক মুহূর্তের গাফিলতি কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই রূপপুরের পরিচালনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের আস্থা অর্জন — এই তিনটি বিষয়ে সরকারকে শতভাগ স্বচ্ছ হতে হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এর সকল নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষিত করতে হবে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহড়া চালাতে হবে।
আজ বঙ্গোপসাগরে একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই দেশে একটি পারমাণবিক কেন্দ্রকে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে নয়, দুর্যোগ সহনশীল করেও গড়ে তুলতে হবে। রূপপুরের নকশায় সেটি করা হয়েছে বলে আমরা জানি, কিন্তু জনগণকে তা বারবার জানাতে হবে।
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের ফিজিক্স টেস্ট সম্পন্ন হওয়া মানে বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকা দেশ নয়। আমরা এখন পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য। এই আলো শুধু পাবনায় নয়, খাগড়াছড়ি থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক। এই আলো আমাদের নতুন গরিবের সংখ্যা কমাবে, কল-কারখানায় চাকা ঘোরাবে, আর বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে বসাবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক