জাতীয়

ইরানের ফাঁদে ট্রাম্পের নীতি-বিপর্যয় ও হরমুজের ভূ-রাজনীতি | দৈনিক শব্দমিছিল

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক বা অর্থনৈতিক বিশালতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে সঠিক সময়ে সঠিক কৌশলগত চাল চালার ক্ষমতার ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তাতে মার্কিন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি-বিপর্যয় ও কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত হয়েছে। চুক্তি বা শর্ত পছন্দ না হলে হুটহাট তা থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নেওয়া ট্রাম্পের চিরচেনা ‘ট্রেডমার্ক পলিসি’ হলেও, ইরানের ক্ষেত্রে এই চাপ প্রয়োগের নীতি যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তি থেকে অবলীলায় বেরিয়ে যাওয়া ট্রাম্প এবার তেহরানের পাতা সুনিপুণ ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদে পা দিয়ে বারবার হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।

জুন মাসের সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর ট্রাম্প যখন বীরদর্পে ঘোষণা করেছিলেন যে, এর মাধ্যমে চিরতরে বন্ধ হবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তিন হাজার বছর পর শান্তি ফিরবে—তখনই বিশ্লেষকেরা এই অতি-উৎসাহের পরিণতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে সিঙ্গাপুর, পানামা কিংবা সাইপ্রাসের পতাকাবাহী জাহাজে হামলার পর ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে চুক্তি বাতিলের যে ঘোষণা দিলেন, সিএনএনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অনুযায়ী তা আসলে ইরানেরই পাল্টা চালের সফল বাস্তবায়ন। হরমুজ প্রণালির একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ইরান নিজেই মূলত এই চুক্তিকে অকার্যকর করেছে এবং ট্রাম্পের নিজস্ব ‘হুটহাট চুক্তি বাতিলের কৌশল’ তার ওপরই প্রয়োগ করে তাকে চরম কূটনৈতিক বিপদে ফেলেছে। চুক্তি ভাঙার পর ট্রাম্পের এই সুর পাল্টানো—‘এটি একটি পরীক্ষা ছিল এবং ইরান তাতে ফেল করেছে’—মূলত মার্কিন প্রশাসনের এক প্রকার মুখরক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সবচেয়ে হাস্যকর এবং নীতিগত দুর্বলতার নজির দেখা গেছে হরমুজ প্রণালির টোল ইস্যুতে। যেখানে হরমুজে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের টোল আরোপকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বলে চিৎকার করছিল, সেখানে ট্রাম্প নিজেই হঠাৎ ২০ শতাংশ ফি বা টোল বসানোর পাল্টা ঘোষণা দিয়ে বসেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা ও হরমুজের বাস্তব সমীকরণের মুখে পড়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় সেই হুমকি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওয়াশিংটনের এই পিছুটান প্রমাণ করে যে, ইরানের ওপর ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্ল্যাকমেইল নীতি এখন অচল। এই সুযোগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে ‘অতি বাড়াবাড়ি’ বলে যে রসিকতা করেছেন এবং তেহরান ন্যায্য হারেই টোল বসাবে বলে যে খোঁচা দিয়েছেন, তা আমেরিকার বৈশ্বিক মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

এই চরম বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এবং জলবায়ু ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন খুব বেশি পথ খোলা নেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ইরান বিশেষজ্ঞ মোস্তফা খোশচেসমের একটি পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, সমস্যাটি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মূল সমস্যা হলো মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের দৃঢ় অবস্থান এবং একটি প্রতিরোধী ‘রোল মডেল’ হিসেবে তেহরানের আত্মপ্রকাশ, যা ওয়াশিংটন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ফলে সমঝোতা ও টোল বিতর্কে ব্যাকফুটে চলে যাওয়া ট্রাম্প প্রশাসন এখন তাদের শেষ অস্ত্র হিসেবে ইরানের ‘পরমাণু কর্মসূচি’র জুজু আবার বিশ্বমঞ্চে সামনে এনে তেহরানকে কোণঠাসা করার মরিয়া চেষ্টা করবে।

ইতিহাস সাক্ষী, ইরানে অতীতে যেকোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযান বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে ওয়াশিংটন সবসময় এই পারমাণবিক কার্ডটি খেলেছে। তবে ২০২৬ সালের এই পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতায়, যেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজার এমনিতেই ভঙ্গুর, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একতরফা সর্বাত্মক যুদ্ধংদেহী পদক্ষেপ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। আমরা আশা করি, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অহমিকা ও হঠকারী নীতি পরিহার করে বাস্তবতার মাটিতে পা রাখবে এবং তেহরানের পাতা ফাঁদ থেকে বাঁচতে আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ কূটনীতির পথ বেছে নেবে।

Related News

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিধনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ জরুরি: প্রতিমন্ত্রী বারী

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের লক্ষ্যে জয়পুরহাটের কালাইয়ে অনুষ্ঠিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিলেন জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী।

অবৈধ মোবাইল ফোন ও রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে চালু হচ্ছে এনইআইআর

বছরে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ও এমএফএস জালিয়াতি বন্ধে ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে চালু হচ্ছে এনইআইআর প্রযুক্তি।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে সারাদেশে ২৭৬ জন দক্ষ ও পেশাদার চালককে সম্মাননা দিচ্ছে সরকার

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে দেশের ২৭৬ জন দক্ষ চালককে সম্মাননা দেওয়ার পাশাপাশি চক্ষু পরীক্ষা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়েছে সড়ক বিভাগ।

৫৯২ কোটি টাকায় খনন হবে তিতাসের দুটি নতুন কূপ, বাড়বে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ৫৯২ কোটি টাকায় দুটি নতুন কূপ খনন প্রকল্প একনেকে উঠছে। জাতীয় গ্রিডে দৈনিক যুক্ত হবে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি খাত অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু: অর্থমন্ত্রী

ফিকি-র আলোচনা সভায় দেশের জ্বালানি খাত, সৌর বিদ্যুৎ ও এনবিআর সংস্কার নিয়ে ফোরেন ইনভেস্টরদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিলেন অর্থ মন্ত্রী।

জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থী কাজ করলে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী: আইনমন্ত্রী |

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ ও পরিস্থিতি নিয়ে ঝিনাইদহে প্রতিক্রিয়া জানালেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান।

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তেজগাঁওয়ে ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে তরুণদের দেশ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা আরও বাড়ানোর আশ্বাস দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধিদলের সাথে মতবিনিময় সভায় ভাতা বৃদ্ধি, চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো ও বিশেষ সুবিধার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর।

Search