শিশুসাহিত্যের প্রিয় ছড়াকার আখতার হুসেন আর নেই
শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার আখতার হুসেন ৮১ বছর বয়সে মারা গেছেন। প্রায় ছয় দশকের সাহিত্যজীবনে ছড়া, গল্প, গান ও শিশুতোষ গ্রন্থ রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি।
ঢাকা: ভরদুপুর। আশ্বিনের ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে রাজধানীর যানজট পেরিয়ে নগর ভবনের সামনে পৌঁছানো। একটু স্বস্তির আশায় পাশের ওসমানী উদ্যানে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্র। পার্কের ফটকে নির্মাণকাজের ছাপ। ভেতরে কংক্রিটের রাস্তা, কোথাও শেওলা, কোথাও বড় বড় ঘাস। নতুন লাগানো চারাগাছের মাঝেও যেন অনাদরের ছাপ।
পার্কের ভেতরে থাকা দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি নেই। অন্যটিতে পানি থাকলেও কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনায় তা প্রায় আড়াল হয়ে আছে। পানিতে ভাসছে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য।
একসময় সবুজে ঘেরা এই উদ্যান ছিল রাজধানীর মানুষের স্বস্তির জায়গা। কিন্তু উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের কারণে প্রায় নয় বছর ধরে সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ রয়েছে পার্কটি। দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এর পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগর-পরিকল্পনাবিদেরা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’ নামে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্সের কার্যাদেশ পরে বাতিল করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশনকে কাজ দেওয়া হয়।
পিএফ করপোরেশনের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁদের অংশের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের কাছে তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, অক্টোবরে পার্কটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার আশা করছেন তাঁরা।
শুধু মূল উন্নয়ন প্রকল্পেই ব্যয় হয়েছে ১০৮ কোটি টাকা। এর আওতায় সীমানাপ্রাচীর, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেশিয়াম, গাড়ি পার্কিং, লেকের পাড় উন্নয়ন, ঘাট, হাঁটার পথ ও বিদ্যুতের উপকেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
এরপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে পার্কে স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি প্রবেশদ্বার নির্মাণের জন্য আরও অর্থ বরাদ্দ করা হয়। শুরুতে এ কাজের জন্য ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নকশায় পরিবর্তনের পর ব্যয় কমিয়ে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা করা হয়।
অর্থাৎ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকল্প ও স্থাপনা নির্মাণ মিলিয়ে গত কয়েক বছরে উদ্যানটিতে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
নগর-পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, উন্নয়নকাজে অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ওসমানী উদ্যানের মূল চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, পার্কে সিভিল বা অবকাঠামোগত কাজের পরিমাণ বেশি হওয়ায় সবুজ ও উন্মুক্ত জায়গার পরিবর্তে কংক্রিটের আধিক্য তৈরি হয়েছে। উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত ভারী নির্মাণকাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, পার্কের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে ভরে গেছে। প্রকৃতিবান্ধব নকশায় উন্নয়ন করা হলে এত দীর্ঘ সময় লাগার কথা নয়।
আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, পার্কের চরিত্র নষ্ট হওয়ার বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো উদ্যানের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
ওসমানী উদ্যানের উন্নয়নকাজ শুরুর সময় গাছ কাটা নিয়ে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ছিল। ‘ওসমানী উদ্যানের ১১ হাজার গাছ রক্ষা আন্দোলন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাঁরা প্রতিবাদও করেছিলেন।
তবে সেই আপত্তির মধ্যেই উন্নয়নকাজ এগিয়ে যায়। এর ফলে উদ্যানের পুরোনো সবুজ পরিবেশের বড় একটি অংশ বদলে যায় বলে পরিবেশবাদী ও নগর-পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ।
মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর নামে নামকরণ করা ২১ দশমিক ৮৫ একরের এই উদ্যানটি রাজধানীর গুলিস্তানে নগর ভবন ও বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত। সবুজ ও খোলামেলা পরিবেশের কারণে একসময় এটি নগরবাসীর অন্যতম বিশ্রামস্থল ছিল।
সাম্প্রতিক নির্মাণকাজের অন্যতম বড় সংযোজন জুলাই শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। প্রায় ৯০ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের এ স্তম্ভে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে।
স্তম্ভের সঙ্গে অর্ধগোলাকার অংশে ব্রিটিশ আমল, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পার্কের দুই প্রবেশপথে ‘২৪’ সংখ্যার আদলে দুটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে।
নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে—ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এমন দাবি এবং অক্টোবরে পার্ক খুলে দেওয়ার ডিএসসিসির আশ্বাসের পর এখন নগরবাসীর অপেক্ষা, কবে দীর্ঘ নয় বছরের বন্ধদশা শেষ হবে।
তবে পার্ক খুলে দেওয়ার পাশাপাশি এর সবুজ পরিবেশ, জলাশয় ও উন্মুক্ত জায়গা কতটা ফিরিয়ে আনা যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর যদি নাগরিকদের কাঙ্ক্ষিত সবুজ ও স্বস্তির জায়গার বদলে উদ্যানটি অতিরিক্ত কংক্রিটনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে উন্নয়নের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন থেকে যাবে।