অব্যবহৃত স্বাস্থ্য অবকাঠামো সচলকরণ এবং দেশের চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নির্দেশনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বছরের পর বছর ধরে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশাল সব ভবন জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে পড়ে থাকা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, বরং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
গত ১২ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর এই তড়িৎ পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ও জনমতের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সিদ্ধান্ত কেবল অব্যবহৃত ভবনগুলোকে সচল করবে না, বরং বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে রাজধানীর ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে আনবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান সংকট হলো উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা-কেন্দ্রিকতা। রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা ও সিলেটের মতো বড় শহরগুলোতে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালগুলো চালু হলে প্রান্তিক পর্যায়ের হাজার হাজার শিশুকে আর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হবে না।
দীর্ঘ সময় ধরে এই অবকাঠামোসমূহ অব্যবহৃত থাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে ক্ষয় হচ্ছিল এবং চুরির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছিল, এই নির্দেশের ফলে তার অবসান ঘটবে। জনবল নিয়োগ এবং আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। এটি একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে প্রকল্পের কাজ কেবল কাগজ-কলমে শেষ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য।
একই সাথে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এবং শাহবাগের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের মতো আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার নির্দেশ দেশের উচ্চতর চিকিৎসাসেবা ও গবেষণার পথ প্রশস্ত করবে। নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতালের কাজ দ্রুত শুরু করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিশাল প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়ন ছাড়াও কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা মূলত সমন্বিত উন্নয়নের একটি আধুনিক কৌশল, যা বৃহৎ প্রকল্পগুলোর দ্রুত সমাপ্তি নিশ্চিত করে।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এই পদক্ষেপগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। একটি সুস্থ ও সবল প্রজন্ম গড়ে তুলতে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালের কোনো বিকল্প নেই। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই হাসপাতালগুলো জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার সফল বাস্তবায়ন স্বাস্থ্য প্রশাসনে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যা প্রমাণ করবে যে সরকার কেবল ভবন নির্মাণে বিশ্বাসী নয়, বরং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ। সঠিক তদারকি ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি স্বনির্ভর ও আধুনিক কাঠামো লাভ করবে, যা উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার পথে অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।