বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ ও বঞ্চনার নাম তিস্তা নদী। বর্ষায় ভাঙন আর শুষ্ক মৌসুমে মরুকরণ—এই দুই চক্রব্যুহ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। সম্প্রতি লালমনিরহাটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিবের বক্তব্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে জোরালো সংকেত পাওয়া গেছে, তা কেবল একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণসঞ্চারের ইঙ্গিত দেয়। চীন সফরের মাধ্যমে এই প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত হওয়া হবে উত্তরবঙ্গের কৃষি ও জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার হলো দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করা। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ এখন দৃশ্যমান। লালমনিরহাটের মতো প্রান্তিক জেলায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর ‘চাকরি মেলা’ মূলত সরকারের সেই কর্মসংস্থানমুখী দর্শনেরই প্রতিফলন। এর মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপও কিছুটা কমবে।
হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং কৃষি ঋণ মওকুফের মতো পদক্ষেপগুলো সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। বিশেষ করে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং একইসাথে কৃষিকাজের জন্য পানির নিশ্চয়তা বিধান করা হচ্ছে। এটি কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা নয়, বরং স্বাবলম্বী হওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার যেভাবে তৃণমূল পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়াচ্ছে, তা দেশের সুষম উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ক্রীড়াক্ষেত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। তৃণমূল পর্যায়ে অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ এবং উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটি তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও বিপথগামিতা থেকে দূরে রেখে সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠনে সহায়তা করবে। শৈশব থেকে প্রতিভাশালী খেলোয়াড় বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে আরও উজ্জ্বল অবস্থানে নিয়ে যাবে।
উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। বুড়িমারী এক্সপ্রেসের মতো সরাসরি ট্রেন চলাচলে লোকোমোটিভ ও বগির স্বল্পতাজনিত যে সংকট রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা এখন সময়ের দাবি। উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন কেবল পণ্য পরিবহন নয়, বরং পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারেও অপরিহার্য। রেলমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী দ্রুত বগি ও ইঞ্জিন সরবরাহ করা গেলে লালমনিরহাটের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নতি নির্ভর করছে কৃষি, শিল্প এবং ক্রীড়া—এই তিন ক্ষেত্রের সুষম উন্নয়নের ওপর। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গ হবে দেশের অন্যতম বড় শস্যভাণ্ডার। পাশাপাশি আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ আরও সুগম হবে। বর্তমান সরকারের এই জনমুখী পরিকল্পনাগুলো যদি যথাযথ তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক