তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল ও তৈরি পোশাক খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন দিগন্ত : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং বিশ্ববাজারে রপ্তানি আয়ের প্রধান প্রাণভোমরা হলো আমাদের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পকারখানাগুলোতে দেখা দেওয়া তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকট এই খাতের উৎপাদন সক্ষমতাকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এই জাতীয় অর্থনৈতিক সংকটের পটভূমিতে, বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জ্বালানি সংকট নিরসনে দ্রুত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের আশ আশ্বাস তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক শিল্প খাতের জন্য এক নতুন আশার বার্তা বয়ে এনেছে।
বিশেষ করে আগামী মাসের মধ্যেই দেশের ‘তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল’ (Floating Storage Regasification Unit – FSRU) স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণাটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত কৌশলগত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের উদ্বৃতি অনুযায়ী, বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা শিল্পকারখানায় তীব্র জ্বালানি সংকট, এনবিআরের অডিট প্রক্রিয়া এবং বন্দর সংক্রান্ত নানাবিধ সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী সংকট সমাধানের জন্য আগামী এক থেকে দেড় বছরের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সমন্বয়ে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। সমস্যা সমাধানে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন প্রত্যক্ষ তদারকি ও সদিচ্ছা দেশের তৈরি পোশাক খাতকে সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে অপরিসীম প্রেরণা জোগাবে।
তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্প প্রবৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব অর্জনের এক মাস্টারপ্ল্যান। নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল যুক্ত হলে এলএনজি পুনর্নবীকরণ বা রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং, ফার্টিলাইজার এবং ইস্পাতের মতো অতি-জ্বালানি নির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতে গ্যাসের তীব্র সংকট অনেকটাই দূর হবে। কারখানার উৎপাদন অব্যাহত থাকলে সময়মতো আন্তর্জাতিক বায়ারের কাছে শিপমেন্ট পাঠানো সম্ভব হবে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বাজারগুলোতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবায়নে কারখানাগুলোর নির্বিঘ্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত এলএনজি সরবরাহ রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহিত হবেন। একই সাথে দেশের কোটি কোটি পোশাক শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে পোশাক রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের রিজার্ভকে শক্তিশালী করবে। একই সাথে এক্সচেঞ্জ রেট ফ্লেক্সিবল রাখা এবং রপ্তানি প্রণোদনার ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ফলে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আত্মবিশ্বাস পাবেন।
পরিশেষে, অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মুখে দেশের পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক দ্রুততম সময়ে ৩য় ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত এবং তৈরি পোশাক খাতের সমস্যা সমাধানে তিন সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন একটি সময়োপযোগী দূরদর্শী পদক্ষেপ।
আমরা আশা করি, সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে নির্ধারিত এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই যেন দেশের শিল্প খাত এই উদ্যোগের সুফল ভোগ করতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়ক পরিবেশের মেলবন্ধনে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।