স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে, জানায়নি ইসি: প্রতিমন্ত্রী
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ৬ জুনের মধ্যে নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য জানিয়েছে ইসি; পাঁচ নির্বাচনে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।
ঢাকা: পদ্মা সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে মাগুখন্দ পর্যন্ত এলাকা থেকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু উত্তোলনের অনুমতি পেতে ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। আবেদনে দেওয়া ঢাকার বছিলা মেইন রোডের ঠিকানায় সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আবেদনে দেওয়া মোবাইল নম্বরও সক্রিয় নয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির আবেদনের পর বালু উত্তোলনের অনুমোদন প্রক্রিয়া এগোলেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় নদীভাঙন ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা। কারণ, যে এলাকায় বালু উত্তোলনের প্রস্তাব করা হয়েছে, তার কাছাকাছি পদ্মা সেতুর ভাটিতে নদীভাঙন রোধে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গত ৪ মে ‘আইকনিক সোর্সিং’-এর প্রোপ্রাইটর হিসেবে সৈয়দ সাদাব মাহবুব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে বালু উত্তোলনের আবেদন করেন। আবেদনে পদ্মা সেতুর ভাটিতে লৌহজং থেকে মাগুখন্দ পর্যন্ত প্রায় ১২৮ দশমিক ৪৪ একর এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতুর মূল ঠিকাদারের ক্রেন চলাচল ও পলি অপসারণের জন্য দেশীয় ড্রেজার দিয়ে একটি চ্যানেল তৈরি করা হবে। কাজটি প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে করার কথা জানিয়েছে। বালু উত্তোলনের বিনিময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি সরকারকে দেওয়ার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উত্তোলন করা বালু কোথায় বা কী কাজে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে আবেদনে সুস্পষ্ট তথ্য নেই।
আবেদনপত্রে ‘আইকনিক সোর্সিং’-এর ঠিকানা হিসেবে ১১৫/১ বছিলা মেইন রোড, ঢাকা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে ওই ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের কাছ থেকেও এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই এলাকায় ১১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ে কয়েকটি ছোট দোকান রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একজনও ১১৫/১ নম্বর হোল্ডিং বা ‘আইকনিক সোর্সিং’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানেন না বলে জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সরকারি দপ্তরে অনুমোদনের চেষ্টা চালাচ্ছেন সৈয়দ সাদাব মাহবুবের ভাই পরিচয় দেওয়া কাজী মো. লিয়াকত। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিষ্ঠানের সঠিক ঠিকানা বা সাদাব মাহবুবের সক্রিয় যোগাযোগ নম্বর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বালু উত্তোলনের প্রস্তাব নিয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নথিতে ভিন্ন ধরনের অবস্থানের কথা উঠে এসেছে। বিআইডব্লিউটিএ থেকে অনাপত্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোলেও পরবর্তী সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয় অনাপত্তি বাতিলের জন্য চিঠি দিয়েছিল বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। পরে একই মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে আরেকটি চিঠি দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে।
প্রস্তাবিত কাজে কাটার সাকশান ড্রেজার ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের ড্রেজার কোম্পানি হিসেবে বিআইডব্লিউটিএতে নিবন্ধিত নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ বলেছেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী বালুমহাল ঘোষণা করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারাদার নির্ধারণের বিধান রয়েছে। বেসরকারি কাউকে এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সরকারি প্রকল্পের উন্নয়নকাজে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কখনো কখনো অনুমতি দেওয়া হয়।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিল গত ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসককে দেওয়া চিঠিতে পদ্মা সেতুর ভাটিতে লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় নদীভাঙন রোধে চলমান ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকার একটি চর নদীর গতিপথ ও ভূমিরূপের পরিবর্তনের কারণে বিলীন হয়ে গেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাইয়েও প্রকল্পের আওতাধীন লৌহজংয়ের গাঁওদিয়া এলাকায় নির্মিত নদীতীর রক্ষা বাঁধের একটি অংশ পদ্মার প্রবল স্রোতে ধসে পড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার এ প্রকল্পের কাজের মান ও বাস্তবায়ন নিয়েও তখন প্রশ্ন উঠেছিল।
বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনায় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু জানিয়েছেন, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং তারা তাদের ফাইন্ডিংস জমা দিয়েছেন। তবে কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।
সংশ্লিষ্ট বৈঠকে স্থানীয় পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন হলে নদীভাঙন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং মাছের প্রজননে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
পদ্মা সেতু নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন এমন দুই প্রকৌশলীও বালু উত্তোলনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, একই স্থান থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করলে নদীতে গভীর খাদ তৈরি হয়ে আশপাশের এলাকায় ভাঙন বাড়তে পারে।
মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী জানিয়েছেন, ‘আইকনিক সোর্সিং’ বালু উত্তোলনের আবেদন করেছে। তবে এখনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। আইনগতভাবে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং নদীভাঙনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত পাওয়া না পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ফলে পদ্মা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভাটিতে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের এ প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে প্রস্তাবিত এলাকায় চলমান নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প এবং নদীর পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতির কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নদীশাসন ও ভাঙনঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।