আন্তর্জাতিক: ইরান সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক অস্থিরতার মধ্যে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ও আরব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর (আইএমইসি) প্রকল্পের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক পথের ঝুঁকি অঞ্চলটির জ্বালানি অবকাঠামোকে বিকল্প পথে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করেছে। তাঁর ভাষ্য, ইরানের প্রভাবাধীন বা ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে তেলসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহনে আইএমইসি এবং পাইপলাইনের মতো বিকল্প অবকাঠামো ভূমিকা রাখতে পারে।
আইএমইসি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয় ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে। এতে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অংশ নেয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য এশিয়া, আরব উপসাগর ও ইউরোপের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো।
পরিকল্পনাটি মূলত দুটি করিডোর নিয়ে গঠিত। পূর্ব করিডোর ভারতকে আরব উপসাগরের সঙ্গে এবং উত্তর করিডোর উপসাগরীয় অঞ্চলকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করবে। এর অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হলো আন্তদেশীয় রেলপথ, যা সমুদ্রপথে আসা পণ্যকে রেলপথে পরিবহনের সুযোগ তৈরি করবে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল যোগাযোগের কেবল এবং পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেন পরিবহনের অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বৈঠকে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবাধীন ঝুঁকিপূর্ণ পথ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামুদ্রিক বাণিজ্যে সাম্প্রতিক হামলা বিকল্প পরিবহনপথের প্রয়োজন আরও বাড়িয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এর পাশাপাশি পাইপলাইনসহ অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরছে।
মূল পরিকল্পনায় আইএমইসি ছিল বাণিজ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি উদ্যোগ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ তৈরির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপের বাজারে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে সমুদ্রপথের পাশাপাশি রেল ও পাইপলাইনভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর কোনো একক পরিবহন করিডোরে পরিণত হয়নি। এর জন্য বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তদেশীয় সমন্বয় এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যেও ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি ইরানকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানান এবং চুক্তিতে না পৌঁছালে দেশটির জন্য আরও কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন।
এর আগে ২০২৬ সালের মার্কিন সামরিক অভিযানের নাম ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ উল্লেখ করে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য; ইরান এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলার কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে সামরিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও একই সময়ে অব্যাহত রয়েছে।
আইএমইসি ২০২৩ সালে ঘোষণার পর থেকেই ভারত, উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের মধ্যে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির একটি বড় অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহপথের স্থিতিশীলতার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাই আইএমইসি শুধু বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রকল্প হিসেবে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প জ্বালানি ও সরবরাহপথ তৈরির বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন কত দ্রুত সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবকাঠামো বিনিয়োগ, রাজনৈতিক সমন্বয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।