বাংলাদেশে বাড়ছে ই-বর্জ্য, ঝুঁকিতে মাটি-পানি ও জনস্বাস্থ্য
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে ই-বর্জ্য বাড়ছে। সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির বর্জ্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
টেকনাফ: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালানের ধরন বদলে যাচ্ছে। একদিকে যুদ্ধের কারণে রাখাইনে খাদ্য, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে এসব পণ্যের তুলনামূলক সহজলভ্যতা—দুইয়ের সুযোগ নিচ্ছে চোরাকারবারি চক্র। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের বিপরীতে দেশে ফিরছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগে নাফ নদ ও টেকনাফকেন্দ্রিক চোরাচালান বেশি আলোচিত হলেও নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা এখন বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করছে। মাছ ধরার নৌকা ও অন্যান্য নৌযানও এসব অবৈধ পণ্য পরিবহনে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধের কারণে পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ায় সেখানে বাংলাদেশি বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এই সুযোগে একটি চক্র বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, চাল, ডাল, ওষুধ, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য পাঠাচ্ছে।
এর বিনিময়ে ইয়াবা ও আইসসহ মাদক বাংলাদেশে আনার অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নগদ অর্থের পরিবর্তে মাদককে বিনিময়মূল্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা ‘নার্কো কারেন্সি’ বা মাদকভিত্তিক লেনদেন হিসেবে বর্ণনা করছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, রাখাইন যুদ্ধবিধ্বস্ত হওয়ায় সেখানে বিভিন্ন পণ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র ‘পণ্য বিনিময় পদ্ধতিতে’ চোরাচালান চালাচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কেন্দ্রীয় মিয়ানমার থেকে রাখাইনে পণ্য সরবরাহেও বিভিন্ন ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাজারে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি এ পরিস্থিতি অবৈধ বাণিজ্যের সুযোগও তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারমুখী বিভিন্ন পণ্য পাচারের চিত্র সামনে এসেছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেন্টমার্টিনের কাছে কোস্ট গার্ডের অভিযানে মিয়ানমারমুখী দুটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৬০০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়। এ সময় ১৮ জনকে আটক করা হয়। কয়েক দিন পর একই এলাকায় আরেক অভিযানে ১ হাজার ১৪০ বস্তা সিমেন্টের পাশাপাশি রসুন, ছোলা, আলু ও ৭ হাজার ৮০টি এনার্জি ড্রিংক জব্দ করা হয়। ওই অভিযানে ১৯ জনকে আটক করা হয়।
গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীর ভাসানচরসংলগ্ন গাংগুরিয়া চরে অভিযান চালিয়ে একটি কার্গো বোট থেকে ২৪ হাজার কেজি ইউরিয়া সার, ৩ হাজার ৭০০ কেজি ছোলা এবং ৬ হাজার ৮৫০ কেজি বুটের ডাল জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এসব পণ্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়ে এলাকায় নেওয়ার কথা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
রাখাইনে নির্মাণসামগ্রীর সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশি সিমেন্ট চোরাকারবারিদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য।
গত ৪ জুন সেন্টমার্টিনের কাছে পাঁচটি মাছ ধরার নৌকা থেকে ১ হাজার ৪৫০ বস্তা সিমেন্টসহ ৫২ জনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা সিমেন্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এর আগে ২ জুন একই এলাকায় দুটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৭০০ বস্তা সিমেন্টসহ ২০ জনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা রাখাইনে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সিমেন্ট নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানানো হয়।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টাকা দামের এক বস্তা সিমেন্ট রাখাইনে প্রায় ১ লাখ মিয়ানমার কিয়াটে বিক্রি হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। দামের এই বড় পার্থক্য চোরাকারবারিদের ঝুঁকি নেওয়ার আর্থিক প্রণোদনা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোরাচালানকারীরা সমুদ্রপথ ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। ফলে বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলজুড়ে মাদক পাচার ঠেকানো নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালী, বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, আনোয়ারা ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় রুট দিয়ে মাদক প্রবেশের প্রবণতা রয়েছে। এতে সীমান্তের অবৈধ বাণিজ্য এখন আর শুধু টেকনাফ ও নাফ নদকেন্দ্রিক থাকছে না; এর বিস্তৃতি সমুদ্রপথে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, কোস্ট গার্ডের অভিযানে বাংলাদেশি বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারে পাচারের সময় জব্দ হয়েছে। এসব পণ্য মিয়ানমারে নেওয়ার পর বিনিময়ে মাদক দেশে আনার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছেন। এসব অভিযানে ইয়াবা ও আইসসহ বিভিন্ন মাদকও জব্দ করা হয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই বদলাচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে দুই দেশের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যেও। যুদ্ধের কারণে ওপারে পণ্যের সংকট এবং বাংলাদেশে তুলনামূলক সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে চোরাচালানকারীরা নতুন বিনিময়ব্যবস্থা গড়ে তুলছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
ফলে বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের পাশাপাশি একই নেটওয়ার্কে মাদক প্রবেশের ঝুঁকিও বাড়ছে। নাফ নদ ও স্থলসীমান্তের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত নৌপথে নজরদারি জোরদার করা এখন সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।