আন্তর্জাতিক: একই মায়ের দুই সন্তান। শৈশবে একসঙ্গে খেলাধুলা, রাজপ্রাসাদের অন্দরে বেড়ে ওঠা এবং খুব কম বয়সে মাকে হারানোর বেদনা—সবমিলিয়ে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারির পথচলা একসময় একই সুতোয় গাঁথা ছিল। ১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যুর পর মায়ের কফিনের পেছনে পাশাপাশি হাঁটা সেই দুই কিশোর আজ প্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু তিন দশক পার হতে না হতেই রাজপরিবারের দুই ভাইয়ের সেই সুদৃঢ় সম্পর্কে তৈরি হয়েছে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব।
রয়টার্স ও এপি সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য এবং রাজপরিবারের পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে এই দুই ভাইয়ের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই।
দীর্ঘ ছয় বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার পর সম্প্রতি স্ত্রী মেগান মার্কেল ও দুই সন্তান আর্চি ও লিলিবেটকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে ফিরে এসেছেন প্রিন্স হারি। গত ২৬ আগস্ট তাঁরা ব্রিটেনে পৌঁছান। যদিও নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে সন্তানদের স্কুলের পরিবর্তন করতে হয়েছে, তবুও দেশের মাটিতে ফিরে আসতে পেরে হ্যারি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি কানাডার একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ব্রিটিশ মাটিতে ফিরে ভালো লাগছে এবং বাচ্চারাও স্কুলে বেশ খুশি।
এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলার ব্যক্তিগত বাসভবন হাইগ্রোভে বাবা রাজা চার্লসের সঙ্গে দেখা করেন হ্যারি। এই সাক্ষাতের ফলে পিতার সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগের দরজা কিছুটা উন্মুক্ত হলেও বড় ভাই উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ এখনো গলেনি।
মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল দুই ভাই একে অপরের ওপর মানসিকভাবে অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিলেন। রাজপরিবারের ভেতরের অভিন্ন অভিজ্ঞতা তাঁদের বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজতন্ত্রে তাঁদের অবস্থান ও পরিচয় আলাদা হয়ে যায়।
জন্ম থেকেই উইলিয়াম ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার-সারির দ্বিতীয় ছিলেন এবং ২০২২ সালে বাবা চার্লস রাজা হওয়ার পর তিনি হন সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী। ভবিষ্যৎ রাজার দায়িত্ব পালনের জন্য কঠোর প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর জীবন গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে হ্যারি ছিলেন ছোট ভাই, যাকে রাজপরিবারের পরিভাষায় ‘স্পেয়ার’ বা অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য করা হতো। পরবর্তীতে নিজের বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’-এ এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন হ্যারি।
দুই ভাইয়ের জন্যই সামরিক বাহিনীতে সেবা দেওয়া ছিল জীবনের একটি বড় অধ্যায়। উইলিয়াম স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিমানবাহিনীর অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী পাইলট হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে হ্যারি ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীতে প্রায় ১০ বছর কাটান এবং আফগানিস্তানে দুই দফা যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন। সেনাজীবন হ্যারিকে রাজপরিবারের বাইরের একটি স্বাধীন পরিচয় এনে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবনেও আসে বড় পরিবর্তন। ২০১১ সালে কেট মিডলটনকে বিয়ে করেন উইলিয়াম। তাঁদের তিন সন্তান—প্রিন্স জর্জ, প্রিন্সেস শার্লট ও প্রিন্স লুই। রাজপরিবারের মূল কাঠামোর ভেতরে থেকেই উইলিয়াম নিজের ভবিষ্যৎ ভূমিকার দিকে এগিয়ে যান।
অন্যদিকে, ২০১৮ সালে মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলকে বিয়ে করেন হ্যারি। এই বিয়ের পর থেকেই রাজপরিবারের প্রথাগত নিয়ম, সংবাদমাধ্যমের আচরণ এবং রাজকীয় দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। ২০২০ সালে হ্যারি ও মেগান রাজপরিবারের কর্মরত সদস্যের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
দুই ভাইয়ের সম্পর্কের দূরত্বকে চূড়ান্ত রূপ দেয় হ্যারির স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’-এর প্রকাশ। বইটিতে হ্যারি শৈশব থেকেই উইলিয়ামের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে মেগানকে বিয়ের সময় দুই ভাইয়ের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। হ্যারির দাবি, মেগানকে বিয়ে না করার পরামর্শ দিয়ে উইলিয়াম তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। এছাড়া মেগান ও কেট মিডলটনের মধ্যকার বিভিন্ন ভুল বোঝাবুঝি এবং রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত সমর্থনের অভাবের অভিযোগও বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসবের জবাবে প্রিন্স উইলিয়াম বা কেনসিংটন প্যালেসের পক্ষ থেকে কখনোই কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য করা হয়নি।
বাবা রাজা চার্লসের সঙ্গে হ্যারির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও উইলিয়ামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। উইলিয়াম ও হ্যারির এই দূরত্ব কেবল পারিবারিক মান-অভিমান নয়; এর সঙ্গে জড়িত রাজপরিবারের ঐতিহ্য, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং রাজকীয় দায়িত্বের প্রশ্ন। পুরোনো সব ক্ষত পেরিয়ে দুই ভাই ভবিষ্যতে কখনো আবার পাশাপাশি দাঁড়াতে পারবেন কি না, তার উত্তর এখন পুরোপুরি সময়ের হাতে।