তারেক রহমানের জাপান সফর: অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর ও জাপানের সাথে ৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ নিবন্ধ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর বাংলাদেশের কূটনীতি ও অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত ২৬ অক্টোবর ভোরে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে টোকিও পৌঁছানোর পর থেকেই তার কর্মব্যস্ততা দেশের প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর যথার্থই বলেছেন, দীর্ঘ যাত্রার পরও বিশ্রাম না নিয়ে তিনি কীভাবে সফরের প্রতিটি মুহূর্তকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন। এটাই একজন রাষ্ট্রনায়কের দেশপ্রেম।
এই সফরকে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফর সেই সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই নতুন উচ্চতা।
সফরের প্রথম দিনের কূটনৈতিক সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের সাথে বৈঠক করেছেন, যেখানে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর মতো প্রভাবশালী নেতা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারো আসোকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন – এটি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য একটি কৌশলগত চাল।
কিন্তু এই সফরের আসল তাৎপর্য লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে। প্রধানমন্ত্রী মারুবেনি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের সভাপতি মাসুমি কাকিনোকির সাথে বৈঠক করেছেন। আমরা এতদিন জাপানকে শুধু ঋণদাতা হিসেবে দেখেছি – মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। কিন্তু বিশ্ব বদলেছে। জাপান এখন ঋণ থেকে বেরিয়ে এসে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব ও পিপিপি মডেলে যেতে চায়।
বৈঠকে যে খাতগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা লক্ষ্য করুন: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন শিল্প, সার উৎপাদন এবং শিল্পকারখানা আধুনিকায়ন। বিশেষ করে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির আধুনিকায়ন ও দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব – এটি আমাদের কৃষি নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত।
আরেকটি বড় অর্জন হলো জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সাথে বৈঠক। প্রধানমন্ত্রী চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা চেয়েছেন – প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং।
সফরের ভূ-রাজনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ২০১৪ সালে শিনজো আবে যে Big-B (Bay of Bengal Industrial Growth Belt) উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার আপডেট ভার্সন এখন আলোচনায়। এটি জাপানের Free and Open Indo-Pacific (FOIP) কৌশলের অংশ। এর অর্থ, বাংলাদেশ এখন আর শুধু সাহায্য গ্রহীতা নয়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের কৌশলগত অংশীদার।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে ফুতসু সিটিতে JERA LNG টার্মিনাল পরিদর্শন, টয়োটা কারখানা ও ইউনিক্লো হেডকোয়ার্টার পরিদর্শন রয়েছে। নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়ার নৈশভোজে অংশগ্রহণও সেই ইঙ্গিত দেয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর সঠিকভাবেই বলেছেন, বাংলাদেশ এখন পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়তে চায়।
আমরা রোটারিয়ান হিসেবে বিশ্বাস করি, উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। এই সফর যদি সফল হয়, তবে কৃষক আধুনিক প্রযুক্তি পাবে, যুবক দক্ষতা ও কর্মসংস্থান পাবে, আর দেশ পাবে জ্বালানি নিরাপত্তা।
আশা করি, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক।