স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সাথে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকসের সাক্ষাৎ। সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ ও বিনিয়োগে আলোচনা।
আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর করবেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এটি তার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সরকারি সফর। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে, কিন্তু এবারের সফরটি একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন গুরুত্ব নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটি নিছক একটি শুভেচ্ছা সফর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণী একটি সফর।
কেন এই সফর এত গুরুত্বপূর্ণ? তিনটি কারণে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। আজই প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, দেশে ‘নতুন গরিব’ এর সংখ্যা বাড়ছে, ৫৬ মাস ধরে মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। বিশ্বব্যাংক বলছে, ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে আছে। এর একমাত্র সমাধান হলো শিল্পায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ। আর এই ক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। জাপান একাই বাংলাদেশের মোট উন্নয়ন সহায়তার প্রায় ২০ শতাংশ দেয়। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, যমুনা রেল সেতু — সব বড় স্বপ্নের পেছনে জাইকার অর্থায়ন আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সফরে জাইকা (JICA), জেট্রো (JETRO) এবং জেবিআইসি (JBIC) — জাপানের তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সাথে বৈঠক করবেন। আলোচনার টেবিলে থাকবে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্যাকেজ, নারায়ণগঞ্জে জাপানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও ২০০ কোম্পানির বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির নতুন চুক্তি।
দ্বিতীয়ত, ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। তারেক রহমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো ‘লুক ইস্ট’ পলিসিকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এতদিন আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই দিল্লি-কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু এবার ভারতের সাথে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন যখন ঝুলে আছে, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে যাচ্ছেন। এটি একটি কৌশলগত বার্তা — বাংলাদেশ এখন একক কোনো দেশের উপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশ এখন জাপান, ভারত, চীন, আমেরিকা সবার সাথে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে চায়। জাপানও চায়, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশকে তাদের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের কেন্দ্র বানাতে। ফলে এই সফর থেকে বাংলাদেশ শুধু অর্থ নয়, কূটনৈতিক দর কষাকষির শক্তিও পাবে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত নেতৃত্বের পরীক্ষা। তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বিশ্বের কাছে তার ভাবমূর্তি এখনো একজন ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে। তাকে প্রমাণ করতে হবে তিনি একজন ‘স্টেটসম্যান’। জাপানের মতো শৃঙ্খলাপূর্ণ, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং অত্যন্ত পেশাদার দেশে নিজেকে একজন যোগ্য অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরাই হবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাপানি বিনিয়োগকারীরা আবেগ নয়, তারা সংখ্যা, নীতি এবং স্থিতিশীলতা দেখে। প্রধানমন্ত্রী যদি তাদের বোঝাতে পারেন যে বাংলাদেশে এখন চাঁদাবাজি বন্ধে নতুন আইন হচ্ছে, পোর্ট ও কাস্টমসে সার্ভার জটিলতা দূর করা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে — তবেই বিনিয়োগ আসবে।
এই সফরে আমাদের প্রত্যাশা কি হওয়া উচিত?
আমাদের প্রত্যাশা পাঁচটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত হওয়া উচিত। এক, মাতারবাড়ি বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি বে অফ বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব গড়ে তোলার চুক্তি। দুই, বাংলাদেশ থেকে ১ লক্ষ দক্ষ কর্মী নেওয়ার জন্য একটি সরকারি চুক্তি, যেখানে জাপানি ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ জাপানই দেবে। তিন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পের জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে জাপানের সহযোগিতা। চার, চট্টগ্রাম-ঢাকা বুলেট ট্রেন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই। পাঁচ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা — জাপান থেকে উপকূল রক্ষায় টহল জাহাজ সংগ্রহ।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এই সফরে ঝুঁকি কি? ঝুঁকি একটাই — শুধু ছবি তোলা আর সংবর্ধনা নিয়ে ফিরে আসা। অতীতে অনেক সরকারপ্রধান জাপান গিয়েছেন, কোটি কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি এনেছেন, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ বিনিয়োগের পরিবেশ দেশে তৈরি হয়নি। তারেক রহমানকে সেই ভুল করা যাবে না। তাকে টোকিওতে বসেই বাংলাদেশে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্ত বিনিয়োগ’ এর গ্যারান্টি দিতে হবে।
জাপানিরা একটি কথা বলে — “Keizoku wa chikara nari” অর্থাৎ ধারাবাহিকতাই শক্তি। ১৯৭২ সালে মরহুম শেখ মুজিবর রহমান যখন জাপান সফর করেন, তখন জাপান বলেছিল, তারা বাংলাদেশের উন্নয়নে থাকবে। ৫৪ বছর ধরে তারা আছে। এখন সময় এসেছে সেই সম্পর্ককে সাহায্য থেকে অংশীদারিত্বে নিয়ে যাওয়ার।
আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই জাপান সফর বাংলাদেশকে ‘সাহায্য নির্ভর’ দেশ থেকে ‘বাণিজ্য নির্ভর’ দেশে পরিণত করার প্রথম সিঁড়ি হবে। তার হাত ধরে জাপানের সূর্যোদয়ের আলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ুক — এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক