ঐক্যই আমাদের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ: ৭ নভেম্বরের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ |রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।
৫১তম জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং ৭ নভেম্বরের চেতনায় জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ নিবন্ধ।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি তারিখ নয়, এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই দিনটি আজ সিপাহী-জনতার বিপ্লব দিবস হিসেবে পরিচিত। বিএনপি ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন দিবসটি গভীর শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দিবসটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে — যা এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশ চলে যায় বঙ্গভবন-কেন্দ্রিক কয়েকজন বিপথগামী মেজরের হাতে। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়। একই রাতে ঘটে কলঙ্কজনক জেলহত্যা — জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে কারাগারে হত্যা করা হয়। দেশ হয়ে পড়ে নেতৃত্বহীন, সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। অনেকের আশঙ্কা ছিল, বাংলাদেশ আবার আধিপত্যবাদের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে।
এই অন্ধকার সময়ে আশার আলো হয়ে আসেন জিয়াউর রহমান। তাঁর দেশপ্রেম, পেশাদারিত্ব ও সৈনিকদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁকে সিপাহীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। ৩ নভেম্বর বন্দী অবস্থায় একটি প্যারালাল টেলিফোনে তিনি কর্নেল তাহেরকে বলেন, “তাহের, ওরা আমাকে বন্দী করেছে, আমার জীবন বিপন্ন।” এই বার্তাই ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে পড়ে।
৭ নভেম্বর ভোরে স্লোগানে মুখরিত হয় ঢাকা সেনানিবাস — “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”, “সিপাহী-জনতা ভাই ভাই, খালেদ মোশাররফের রক্ত চাই”। সাধারণ সৈনিক ও জনতা এক হয়ে রাস্তায় নামে। ফোর বেঙ্গল ও টু ফিল্ড রেজিমেন্টের সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত সিপাহী-জনতার বিপ্লব, যার কেন্দ্রে ছিলেন জিয়াউর রহমান।
মুক্ত হয়েই জিয়াউর রহমান যে কাজটি করেন, তা-ই তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন, চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের আশঙ্কা থেকে দেশকে রক্ষা করেন। তিনি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত করেননি, বরং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন।
শহীদ জিয়ার অবদান শুধু ৭ নভেম্বরে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক। ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি গ্রামে গ্রামে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দেন, খাল খনন কর্মসূচি, গার্মেন্টস শিল্পের ভিত্তি স্থাপন, সার্ক গঠনে উদ্যোগ — সবই তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সৈনিকও দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক হতে পারেন।
আজ যখন ৭ নভেম্বরকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে — এই দিনটি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন। বিএনপি এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে কারণ এই দিনেই তাদের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়া জাতির ক্রান্তিলগ্নে হাল ধরেছিলেন।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা কাম্য নয় — জেলহত্যা হোক বা খালেদ মোশাররফ হত্যা। কিন্তু ৭ নভেম্বরের মূল চেতনা হলো — সিপাহী ও জনতা যখন এক হয়, তখন কোনো ষড়যন্ত্রই টেকে না। শহীদ জিয়ার আদর্শ — বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, ঐক্য ও স্বনির্ভরতা — আজও আমাদের পথ দেখায়।লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক।