আশার আলোয় উত্তরবঙ্গ: তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ ও বঞ্চনার নাম তিস্তা নদী। বর্ষায় ভাঙন আর শুষ্ক মৌসুমে মরুকরণ—এই দুই চক্রব্যুহ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’
একটি জাতির আত্মপরিচয় এবং গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন তা কেবল অতীতের স্মৃতি থাকে না, বরং ভবিষ্যতের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর পরিদর্শন এবং তাঁর দেওয়া বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে চিহ্নিত করেছে। এই জাদুঘর কেবল ইট-পাথরের দেওয়াল নয়, বরং ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং ছাত্র-জনতার অকুতোভয় আত্মত্যাগের এক জীবন্ত দলিল।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছরের নিপীড়ন, নৈরাজ্য এবং ‘মাফিয়াতন্ত্রের’ যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে শাপলা চত্বরের ঘটনা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব—প্রতিটি ঘটনাই এই জাদুঘরে অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি এবং ‘আয়নাঘর’-এর মতো পৈশাচিক নির্যাতনের মিনিয়েচার প্রদর্শনী দেশবাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে, একটি রাষ্ট্র যখন স্বৈরাচারের কবলে পড়ে, তখন তা কতটা অমানবিক হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত করতে এই সত্যগুলো নথিবদ্ধ থাকা অপরিহার্য।
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের বীর শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ এবং ওয়াসিমদের রক্তে ভেজা জামাকাপড় ও স্মৃতিচিহ্ন এই জাদুঘরের সবচেয়ে আবেগঘন অংশ। স্পিকার সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা জাতির ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের বর্তমানকে উৎসর্গ করেছেন।
শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীনের নিজ হাতে বানানো সংসদ ভবনের মিনিয়েচার কিংবা শহীদ আবু ইসহাকের রক্তমাখা জামা কেবল প্রদর্শনী বস্তু নয়, এগুলো আগামীর শাসকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে—জনগণের অধিকার কেড়ে নিলে তারুণ্য এভাবেই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও নাগরিক অধিকার সচেতনতার এক স্থায়ী বীজ বপন করেছে।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের ভাষায়, এই জাদুঘর ফ্যাসিজম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার ‘প্রতিবিম্ব’। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনই মূলত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের লড়াই। জুলাই জাদুঘরের ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ রোডটি সেই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি।
শাপলা চত্বরের স্মৃতি কর্নার কিংবা আবরার ফাহাদের ওপর ছাত্রলীগের নৈরাজ্যের স্মৃতি সংরক্ষণ করার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে আর কোনো ছাত্র বা নাগরিক যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হয়।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষে বা আগস্টের শুরুতে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া হবে একটি বড় সাংস্কৃতিক বিজয়। এই জাদুঘরটি যখন সাধারণ মানুষ পরিদর্শন করবে, তখন তা একটি শক্তিশালী জনমত তৈরি করবে—যেখানে স্বৈরাচারী মানসিকতা বা ফ্যাসিবাদের কোনো স্থান থাকবে না। ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য এমন একটি ‘মেমোরি সেন্টার’ প্রয়োজন ছিল, যা প্রতিটি সরকার ও শাসককে তাঁদের জবাবদিহিতার কথা মনে করিয়ে দেবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর কেবল অতীতের শোকগাথা নয়, এটি একটি গর্বিত জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি ন্যায়বিচারের লড়াইকে বেগবান করবে এবং ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে নীতিনির্ধারকদের অনুপ্রাণিত করবে। স্পিকারের পরিদর্শন এবং এই জাদুঘরের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ আজ এক মুক্ত ও ভয়হীন আগামীর পথে ধাবমান। ছাত্র-জনতার এই বীরত্বগাথা যত দিন এই জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকবে, তত দিন এ দেশে স্বৈরাচারের পুনরুত্থান অসম্ভব হয়ে পড়বে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক