দুর্গাপূজায় ২০-২২ অক্টোবর ছুটি, টানা ৫ দিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা
দুর্গাপূজায় ২০ থেকে ২২ অক্টোবর ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ১৭ অক্টোবর শনিবার অফিস খোলা থাকবে এবং ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি পুনর্বহাল।
ইউরোপ বলতেই আমাদের চোখে সাধারণত ভেসে ওঠে আকাশচুম্বী আধুনিকতা, যান্ত্রিক জীবন আর প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ। কিন্তু এই মহাদেশেরই এক কোণে, পর্তুগালের রিবাতেজো অঞ্চলের মোইতা শহরে পা রাখলে সেই ধারণা এক নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। মে মাসের শেষ সপ্তাহের এক সন্ধ্যায় লিসবন থেকে দূর মোইতা শহরের ‘ফেইরা দে মামেলা’ মেলার আলোকছায়ায় অবগাহন করতে গিয়ে মনে হতে পারে—আমরা যেন আজ থেকে ৫০ বছর আগের কোনো ক্লাসিক ইউরোপিয়ান আর্টহাউস সিনেমার সেটে এসে দাঁড়িয়েছি। ধীর আলো, পুরোনো দেয়াল, সরু রাস্তা আর এক অদ্ভুত গ্রামীণ গন্ধ—সবকিছুতেই যেন সময় এখানে একটু ধীরে চলে। পর্তুগালের এই ঐতিহ্যবাহী মেলা আর তাদের অনন্য ‘বুল ফাইট’ বা ষাঁড়ের লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভৌগোলিক সীমানা বা ভাষার প্রাচীর দিয়ে মানুষকে আলাদা করা গেলেও, উৎসবের আনন্দ আর লোকজ সংস্কৃতি আঁকড়ে বাঁচার আদিম আকাঙ্ক্ষায় পৃথিবীর সব মানুষ আসলে এক ও অভিন্ন।
মেলার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দের মাঝে যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে গরম গরম জিলাপি ভাজার মতো চেনা এক দৃশ্য, তখন যে কোনো বাঙালির নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। পর্তুগিজদের ঐতিহ্যবাহী মেলার খাবার ‘Farturas Churros Recheados’ দেখতে ঠিক আমাদের জিলাপির মতো হলেও, এর স্বাদে লুকিয়ে আছে গ্রামবাংলার চেনা পিঠা-পুলির এক অদ্ভুত পরশ। এই সাধারণ একটি খাবার যেন এক পরম সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করায়—বাইরে থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিকে যতটাই আলাদা মনে হোক না কেন, তাদের অন্তরের গভীরে, মানুষের স্বাদের ও আনন্দের রসায়নে অদ্ভুত কিছু মিল থেকেই যায়। মোইতার এই মেলা যেন আমাদের দেশের চিরচেনা বৈশাখী মেলা, ষাঁড়ের হাট কিংবা ঈদের আগের রাতের সেই জমজমাট আবেগেরই এক ইউরোপীয় সংস্করণ।
বিশ্বের অনেক দেশে—বিশেষ করে স্পেনে ‘বুল ফাইট’ বা ষাঁড়ের লড়াই মানেই যেখানে দিনশেষে অবলা পশুকে দর্শকদের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করার এক রক্তাক্ত মহোৎসব, সেখানে পর্তুগালের ঐতিহ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মানবিক। এখানে ষাঁড়কে হত্যা করা হয় না; বরং পুরো আয়োজনটি রূপ নেয় সাহস, দলগত সমন্বয় এবং প্রাচীন কৌশলের এক লাইভ থিয়েটারে।
প্রথমে ঘোড়ার ওপর চড়ে ‘cavaleiro’ বা সওয়ারিরা ক্ষীপ্র গতিতে ষাঁড়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। এরপর আসে আসল রোমাঞ্চ—একদল মানুষ, যাদের ‘forcados’ বলা হয়, তারা কোনো অস্ত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ খালি হাতে বুক চিতিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় বিশাল এক ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের সামনে। শুধু সাহস আর নিখুঁত দলগত সমন্বয় দিয়ে কীভাবে সেই দানবীয় পশুকে থামানো হয়, তা স্টেডিয়ামের হাজার হাজার দর্শকের শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা আর করতালির মাধ্যমে এক মহাকাব্যিক রূপ লাভ করে। এটি কেবল কোনো খেলা নয়, এটি রিবাতেজো অঞ্চলের বহু শতাব্দীর ইতিহাস, কৃষি ও পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমানো তরুণদের জন্য ডিগ্রি অর্জনই শেষ কথা নয়। আসল সার্থকতা লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর নানা রঙের মানুষ, তাদের যাপন ও সংস্কৃতিকে এত কাছ থেকে অনুধাবন করার মধ্যে। নিচের সংক্ষিপ্ত ছকটি আমাদের চেনা লোকজ সংস্কৃতির সাথে পর্তুগিজ সংস্কৃতির এক চমৎকার সামঞ্জস্য তুলে ধরে।
বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণী কিংবা পুরো পরিবার মিলে যেভাবে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে ভালোবেসে বুকে আগলে রেখেছে, তা আমাদের শহরকেন্দ্রিক আধুনিক ও যান্ত্রিক ধারণাকে এক বড় ধাক্কা দেয়। পশ্চিমা বিশ্ব আধুনিকতার চূড়ায় বসেও তাদের শত বছরের পুরোনো লোকজ পোশাক, ঘোড়া আর গ্রামীণ স্মৃতিকে ভুলে যায়নি, বরং পরম গর্বে তা নতুন প্রজন্মের ধমনিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে মোইতা শহরের মেলার আলো হয়তো নিভে আসে, কিন্তু একজন প্রবাসী ছাত্র বা কলামিস্টের মনে পর্তুগালকে নতুনভাবে চেনার যে জানালা খুলে যায়, তা চিরকাল ভাস্বর থাকে। সংস্কৃতি কখনো সীমানা চেনে না। মানুষের আনন্দ, উৎসব এবং দলবদ্ধভাবে বেঁচে থাকার যে চিরন্তন আকুতি, তা পদ্মা-মেঘনার পাড় থেকে শুরু করে লিসবনের আটলান্টিকের তীর পর্যন্ত একই সুর তৈরি করে। ইউরোপের যান্ত্রিক অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গ্রামীণ ও মায়াবী রূপকে দৈনিক শব্দমিছিল-র পক্ষ থেকে আমরা সাধুবাদ জানাই। পৃথিবীর সব লোকজ সংস্কৃতি বেঁচে থাকুক তার নিজস্ব মহিমায়, মানুষের মেলবন্ধনের সেতু হয়ে।