নিজেরা কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি, অথচ তাদের বলেই কাঁপছে বিশ্বমঞ্চ!
বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে খেলাটির নান্দনিকতা মানেই মাঠের তারকা খেলোয়াড়দের পায়ের জাদু। কিন্তু যে বলটি ঘিরে এত উন্মাদনা, তার জন্ম কোথায়—তা অনেকেরই অজানা। বিস্ময়কর…
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই কেবল মাঠের জয়-পরাজয় কিংবা গোলের হিসাব নয়; এর পেছনে লুকিয়ে থাকে নানা আবেগ, লড়াই আর কৃতজ্ঞতার গল্প। চলমান বিশ্বকাপে নানা ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বিধিনিষেধ আর ফিফার দ্বিমুখী নীতির চোখরাঙানি উপেক্ষা করে মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের জাত চিনিয়েছে ইরান। শুধু খেলায় নয়, মাঠের বাইরেও তারা রেখে গেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে মেহদি তারেমিদের রেখে যাওয়া একটি ছোট্ট চিরকুট এখন ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে নাড়া দিচ্ছে।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে ইরানের নকআউট পর্বে যাওয়ার স্বপ্ন এখনো টিকে রয়েছে। তবে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে সমানে। এমন এক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের ড্রেসিংরুমে একটি হৃদয়স্পর্শী বার্তা রেখে গেছে ইরানি দল।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা সেই হাতে লেখা চিঠিতে লেখা ছিল—
“হাজার বছরের প্রাচীন পারস্য সভ্যতার ঐতিহ্য থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ইরান পর্যন্ত—আমাদের চেতনা সবসময়ই জীবন্ত এবং অটল। চমৎকার আতিথেয়তার জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা এখানে বুকভরা গর্ব নিয়ে এসেছিলাম, মাঠের লড়াইয়ে সর্বোচ্চ সম্মান বজায় রেখে খেলেছি এবং মাথা উঁচু করে মর্যাদা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি।”
চিরকুটের শেষ অংশে ইরানি সমর্থক, যারা গ্যালারিতে গলা ফাটিয়ে দলকে সমর্থন জুগিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। সমর্থকরা দলের জন্য তাদের ‘হৃদয়, কণ্ঠ এবং আত্মা’ উজাড় করে দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। একই সাথে বিশ্বের সমস্ত দেশের মধ্যে শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুদৃঢ় বন্ধুত্বের আহ্বান জানায় ইরান দল।
উল্লেখ্য, লস অ্যাঞ্জেলেসে গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ খেলেছে ইরান। তবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বৈরিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অবস্থান ও ভ্রমণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি দলের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্টাফের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এই জটিলতার কারণে ইরান দল মূল টুর্নামেন্ট চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোর তিজুয়ানায় অবস্থান করছে এবং সেখান থেকেই ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করছে।
অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানি দলের এই ভ্রমণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করার ব্যাপারে আলোচনা চলছে।
তবে দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই বাড়তি ঝক্কি ও বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের কোচ আমির গালেনোয়ি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এবারের বিশ্বকাপে ইরানকে এমন কিছু নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা টুর্নামেন্টের অন্য কোনো দলকে পোহাতে হয়নি।
সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইরানের সামনে এখনো শেষ ১৬-তে যাওয়ার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মাঠে নামবে তারা। সেই ম্যাচের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে—ইরান কি সত্যিই বিশ্বকাপকে বিদায় জানাবে, নাকি বিশ্বমঞ্চে তাদের রূপকথার গল্প আরও দীর্ঘ হবে।