তেহরানে ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগ’ শোভাযাত্রা, অংশ নিলেন লাখো মানুষ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে তেহরানে ‘জানফাদা-ই-ইরান’ শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষ অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক: একসময় উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে সীমিত প্রভাব থাকা একটি জায়দি শিয়া আন্দোলন ছিল হুথিরা। কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত পেরিয়ে সংগঠনটি এখন ইয়েমেনের অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরের উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের পর বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে তাদের সামরিক প্রভাব আরও বেড়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে হুথিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের সমর্থন ও সামরিক প্রযুক্তি হুথিদের সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে জায়দি শিয়া মুসলিমদের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে হুথিদের উত্থান শুরু হয়। পরে ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে একাধিক দফা যুদ্ধে জড়িয়ে তারা শক্তিশালী স্থানীয় সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়।
২০১১ সালের আরব বসন্তে ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে হুথিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বাড়াতে শুরু করে। একই সময়ে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্কও গভীর হয়।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যদিও রাজনৈতিক সমাধান স্থায়ী হয়নি।
২০২৩ সালে গাজায় ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুথিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। এরপর ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালায় তারা। এসব হামলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও হুথিদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে।
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলক স্থিতাবস্থা থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেনে আবার বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়েছে। হুথিরা দক্ষিণ তিহামা অঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বন্দরনগরী মোচা এবং লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করেছে। তারা বাব আল-মান্দাবের কাছে মায়ুন দ্বীপসহ আরও কিছু দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এ পথে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে এশিয়া-ইউরোপের বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রীও সাম্প্রতিক সময়ে এই নৌপথে নিরাপত্তা জোরদারে আরও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন।
হুথিদের অগ্রগতির ফলে সৌদি আরবের লোহিত সাগরমুখী তেল রপ্তানি পথও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব হুথি অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।
হুথিদের সামরিক সক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও অতীতে হামলার লক্ষ্য হয়েছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে তারা।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে হুথিদের অস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিজস্ব উৎপাদন—দুই ধরনের উৎসের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ইয়েমেনে জব্দ করা সরঞ্জামের মধ্যে ড্রোনের ইঞ্জিন, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নেভিগেশন-সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি এবং ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে হুথিদের সঙ্গে ইরানের কুদস বাহিনী এবং হিজবুল্লাহর সদস্যদের যোগাযোগ ও সহযোগিতার কথাও উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে হুথিদের অস্ত্র, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। ইরান অবশ্য হুথিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের হিসাবে হুথিদের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিবেদনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়োগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, স্থানীয় নিয়োগ, সংগঠিত সামরিক কাঠামো এবং ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ হুথিদের একটি স্থানীয় মিলিশিয়া থেকে বড় সামরিক শক্তিতে রূপান্তরে সহায়তা করেছে। তাদের সক্ষমতার মধ্যে ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, গোলাবর্ষণ, অনুপ্রবেশ এবং মাইন ও বিস্ফোরক ব্যবহারের মতো কৌশল রয়েছে।
সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে হুথিরা এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি পক্ষ নয়; লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে। একই সময়ে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনে মানবিক সংকটও আরও গভীর হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে এক লাখের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়েছে।