শিশু অপ্রতিম হত্যা ও জননিরাপত্তার সংকট; প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নাকি সামাজিক অবক্ষয়?
অপ্রতিম হত্যা, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার ব্যবস্থার দুর্বলতা, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশেষ সম্পাদকীয়।
সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাতীয় অর্থনীতি, সামাজিক জীবনযাত্রা এবং জনমনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, লোহিত সাগর ও প্রণালীকেন্দ্রিক নিরাপত্তা সংকট, ইউরোপীয় বাজারে জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধি এবং শিপিং বা ফ্রেইট চার্জ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই দাম বাড়ানো বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিপিসির বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান সামাল দিতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য ছিল বলে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
একই সাথে, একশ্রেণীর বিশ্লেষকদের মতে, বিগত বছরগুলোতে দেশের মানুষের গড় আয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সহ্য করার মতো নাগরিক সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষকদের চোখে এই বাস্তবতার অন্য একটি গুরুতর দিকও রয়েছে, যা গভীর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের দাবি রাখে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক সংকটকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অস্থিরতায় অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সার্বিক দিক বিবেচনায় আমদানিনির্ভর একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য তেলের বাড়তি ক্রয়মূল্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা দীর্ঘকাল একা বহন করা যেকোনো সরকারের জন্যই কঠিন। তবে এই বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে যেভাবে এক লাফে বিশাল অঙ্কের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া কেবল একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার দর বৃদ্ধি পাওয়া একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া বা ‘চেইন রিয়্যাকশন’। ডিজেল ও কেরোসিন কেবল পরিবহনের জ্বালানি নয়; বরং তা আমাদের কৃষিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা, কাঁচামাল পরিবহন, শিল্প কারখানার উৎপাদন এবং পাইকারি ও খুচরা সরবরাহ শৃঙ্খলের মূল ভিত্তি। পরিবহনের ভাড়া ও উৎপাদন খরচ একধাক্কায় বেড়ে গেলে বাজারের শাকসবজি, চাল, ডাল থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রতিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।
অবশ্যই, দেশের মাথাপিছু আয় ও সাধারণ মানুষের অর্জনের সূচক আগের চেয়ে বেড়েছে—এই পরিসংখ্যানিক সত্যটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ‘জাতীয় গড় আয় বৃদ্ধি’ এবং ‘সাধারণ নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব’ এক কথা নয়। মুদ্রাস্ফীতির বর্তমান হার যখন উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তখন নিত্যপণ্যের দামের সামান্য বৃদ্ধিও প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট বেতনের মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। আয় বাড়লেও জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয় যদি একই গতিতে বা তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তবে প্রকৃত আয় কার্যত হ্রাস পায়। ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়বে না—এমন ধারণাকে কেবল পরিসংখ্যানের আলোকে দেখলে বাস্তব সামাজিক চিত্রটি আড়ালেই থেকে যায়।
অতএব, বিশ্ববাজারের অনিবার্য চাপ সামলাতে সরকারের যদি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প না-ও থাকত, তবুও সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল সাধারণ মানুষকে এই মূল্যস্ফীতির কষাঘাত থেকে আংশিক রক্ষা করা। শুধু তেলের দাম বাড়িয়ে লোকসান কমানোর সহজ পথ না খুঁজে জ্বালানি খাতের অপচয়, সিস্টেম লস এবং প্রশাসনিক অনিয়ম দূর করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে, পণ্য পরিবহনে সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃষকের সেচে বিশেষ সরকারি প্রণোদনা প্রদান এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নেট (যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যে খাদ্য বিতরণ) সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল সরকার কেবল আন্তর্জাতিক সংকটের অজুহাত দিয়ে দায় এড়াতে পারে না; বরং আন্তর্জাতিক ঝড়ের মাঝে দেশের সাধারণ নাগরিক ও অর্থনীতির সুরক্ষাব্যূহ তৈরি করাই হলো সুশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।