নিরাপদ সড়ক ও চলাচলের নৈতিকতা ইসলাম কী শিক্ষা দেয়?
রাস্তায় চলাচলের শিষ্টাচার, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং নিরাপদ সড়ক গঠনে ইসলাম কী শিক্ষা দেয়, তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন। ইসলাম ও জীবন।
ইসলাম: ইসলামকে অনেকে প্রায়শই নিছক কিছু আনুষ্ঠানিক উপাসনা, খণ্ডিত বিশ্বাস কিংবা নির্দিষ্ট কিছু বিধানের সমষ্টি বলে মনে করেন। অথচ মানুষের চিন্তা থেকে কর্ম, বিশ্বাস থেকে প্রাত্যহিক আচরণ এবং ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজব্যবস্থা—সবক্ষেত্রেই রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা। ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন রীতির সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রগতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের এই সামগ্রিক রূপরেখা এবং বহুমাত্রিক ভিত্তির এক অনন্য ও প্রামাণ্য পরিচয় ফুটে উঠেছে সুপরিচিত ‘হাদিসে জিবরাইল’-এ।
ইসলামি ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বে এই হাদিসটির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ইমাম ইবনে রজব আল-হাম্বলি (রহ.) এই হাদিসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, এই একটিমাত্র হাদিস সমগ্র ধর্মের মৌলিক ও শাখাগত যাবতীয় বিধানকে নিজের ভেতর ধারণ করেছে। যেভাবে পবিত্র কুরআনের মূল হিসেবে সুরা ফাতিহাকে ‘উম্মুল কুরআন’ বলা হয়, ঠিক তেমনি হাদিসে জিবরাইলকে অভিহিত করা যেতে পারে ‘উম্মুস সুন্নাহ’ বা সমগ্র সুন্নাহর মূল হিসেবে।
হাদিসটির বর্ণনাকারী সাহাবি হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের নিয়ে বসে থাকা অবস্থায় ধবধবে সাদা পোশাক ও ঘন কালো চুলের এক অচেনা ব্যক্তি মজলিসে উপস্থিত হন। তাঁর বেশভূষায় কোনো দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি বা চিহ্ন ছিল না, অথচ উপস্থিত সাহাবিদের কেউ তাঁকে চিনতেনও না। তিনি অত্যন্ত বিনম্রভাবে নবীজির মুখোমুখি বসে নিজের দুই হাঁটু নবীজির হাঁটুর সঙ্গে মেলালেন এবং হাত দুটি নবীজির ঊরুর ওপর রাখলেন।
এরপর তিনি ইসলাম, ইমান, ইহসান এবং কেয়ামত সম্পর্কে একের পর এক মৌলিক প্রশ্ন করতে থাকেন এবং নবীজি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে প্রতিটির উত্তর দেন। আগন্তুক চলে যাওয়ার পর নবীজি সাহাবিদের জানান যে তিনি ছিলেন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.), যিনি এসেছিলেন মানুষকে তাদের দ্বীন বা ধর্ম শিক্ষা দিতে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)
জিবরাইল (আ.) প্রথমেই জানতে চেয়েছিলেন, ইসলাম কী? উত্তরে নবীজি (সা.) ইসলামের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেন—শাহাদাত বা আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুলের রিসালতের সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, রমজানের রোজা রাখা এবং সামর্থ্যবানদের জন্য হজ পালন করা।
এখানে ইসলামের প্রায়োগিক ও বাহ্যিক দিকটি স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বাস মানুষের অন্তরের বিষয় হলেও ইসলাম কেবল ভাবালুতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা কর্ম ও দায়িত্বশীলতায় রূপ নেয়। নামাজ আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্য, রোজা আত্মসংযমের প্রশিক্ষণ, জাকাত সম্পদে অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার সামাজিক দায় এবং হজ রবের সমীপে পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক।
এরপর ইমান সম্পর্কে জানতে চাইলে নবীজি ইমানের ছয়টি স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেন—আল্লাহ, ফেরেশতাকুল, আসমানি কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, আখেরাত এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি মনেপ্রাণে বিশ্বাস স্থাপন। ইসলাম যেখানে মানুষের বাহ্যিক দেহ, ইমান সেখানে তার আত্মিক প্রাণ। অদৃশ্য বাস্তবতায় বিশ্বাস মানুষকে আত্মসচেতন করে তোলে, আখেরাতের চেতনা মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপে জবাবদিহির শিক্ষা দেয় এবং তাকদিরে গভীর আস্থা জীবনের যেকোনো সংকট ও ব্যর্থতায় পরম মানসিক স্বস্তি জোগায়।
হাদিসে জিবরাইলের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী শিক্ষা হলো ‘ইহসান’। ইহসান সম্পর্কে নবীজি অতুলনীয় সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন।’
মানুষ লোকচক্ষুর সামনে বা সামাজিক লজ্জায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলেও তার আসল চরিত্র উন্মোচিত হয় নির্জনে। ইহসান হলো সেই নিরবচ্ছিন্ন আত্মিক সচেতনতা, যা মানুষকে একাকিত্বেও সৎ ও নিষ্কলুষ রাখে। বিশিষ্ট মুফাসসির ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যাহ উল্লেখ করেছেন যে, ইহসান হলো ধর্মের আত্মা ও মূল নির্যাস; যখন কোনো বান্দা এই অনুভূতি নিয়ে ইবাদতে দাঁড়ায় যে রব তাকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন, তখন তার অন্তর থেকে অহংকার ও প্রদর্শনপ্রিয়তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কেয়ামতের সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে নবীজি বিনম্রভাবে জানান যে এ বিষয়ে প্রশ্নকারী ও যাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, উভয়ের জ্ঞানই সমান; মহাজাগতিক এই ক্ষণের চূড়ান্ত সময় একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অবগত। এর মাধ্যমে অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে অবান্তর অনুমানে মেতে না থেকে বর্তমান মুহূর্তকে সৎকাজে লাগানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, কারণ প্রতিটি মানুষের মৃত্যুই তার জন্য একধরনের ব্যক্তিগত কেয়ামত।
হাদিসে জিবরাইল কেবল বিশ্বাসের পাঠ নয়, এটি জ্ঞানচর্চারও এক অনুপম শিক্ষাপদ্ধতি। শিক্ষকের সামনে পরিপাটি বেশে ও পরম বিনয়ের সঙ্গে বসা, অহেতুক তর্ক পরিহার করে সঠিক ও অর্থবহ প্রশ্ন করার মাধ্যমে জ্ঞান অন্বেষণের চমৎকার শিষ্টাচার এখানে ফুটে উঠেছে। ফকিহ কাজি ইয়াদ উল্লেখ করেছেন যে, অজানা বিষয় জেনে নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং না জেনে ভুল পথে চলার চেয়ে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হওয়াই ইসলামের নির্দেশ।
পরিশেষে, ইসলাম নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন রীতির সমষ্টি নয়, বরং এটি বিশ্বাস, কর্ম ও চরিত্রের এমন এক মেলবন্ধন, যা মানুষের পার্থিব জীবনকে প্রশান্তিময় করে এবং অনন্ত আখেরাতে মুক্তির পথ সুগম করে।