সম্পাদকীয়

ইশতেহার থেকে বাস্তবতা: তারেক রহমানের নতুন সংগ্রামের ডাক ও আগামীর বাংলাদেশ

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মাধ্যমে জয়লাভ করা কেবল একটি যাত্রার শুরু, গন্তব্য নয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে (কেআইবি) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তাঁর বক্তব্য মূলত ‘নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি’কে ‘রাষ্ট্রীয় দলিলে’ রূপান্তর করার একটি রূপরেখা। দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি তাঁর এই দিকনির্দেশনা একটি জবাবদিহিতামূলক ও সুশাসিত রাষ্ট্র গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, নির্বাচনের আগে যা ছিল একটি রাজনৈতিক দলের ‘ম্যানিফেস্টো’, বিজয় পরবর্তী সময়ে তা এখন ‘জনগণের ইশতেহারে’ পরিণত হয়েছে। এই বক্তব্যটি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি বুঝিয়ে দেয় যে, সরকার এখন কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সকল নাগরিকের।

ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়ন করা এখন সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই দর্শনের প্রচার ও প্রসার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের দীর্ঘদিনের অনাস্থা দূর করতে সহায়ক হবে।

তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “আমাদের একটি যুদ্ধ শেষ হয়েছে, এখন আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে।” দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সফল সমাপ্তির পর এখনকার যুদ্ধটি হলো দেশ গড়ার। ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে বিধ্বস্ত হওয়া প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নাগরিক নিরাপত্তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা একটি কঠিন কাজ। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত শিক্ষার পরিবেশ এবং নারী-শিশুদের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা বাস্তবায়নে কেবল বাজেট বা পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতা ও নৈতিক অবস্থান।

বিগত স্বৈরাচারী আমলে বাংলাদেশের মানুষ গুম, খুনের শিকার হয়েছে এবং কথা বলার স্বাধীনতা হারিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে সেই অন্ধকার অধ্যায়ের স্মৃতি এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বপ্ন দেখছেন যেখানে সুস্থ বিতর্ক হবে এবং মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে। এটি মূলত একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের ভিত্তি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি এই পথে এগোতে পারে, তবে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

রাজনৈতিক দল ও সরকারের মধ্যে সঠিক সমন্বয় না থাকলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে অথবা দলীয় প্রভাবের কারণে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নষ্ট হয়। তারেক রহমান তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের কাছে যে সহযোগিতা চেয়েছেন, তা কোনো অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়, বরং ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করার জন্য। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং তৃণমূল পর্যায়ে ইশতেহারের সুফল পৌঁছে দিতে দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর (যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল) দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি নির্ভর করছে এই ইশতেহারের সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। যদি প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত সুশাসন, শিক্ষার নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং মেধাবী তরুণরা দেশ গঠনে উৎসাহিত হবে। তারেক রহমানের এই ‘নতুন সংগ্রাম’ সফল হলে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবেই নয়, বরং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবেও বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ডাক মূলত একটি অঙ্গীকারনামা। তিনি কেবল স্বপ্ন দেখাচ্ছেন না, বরং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি নেতা-কর্মীকে দায়বদ্ধ করছেন। জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানিয়ে ইশতেহার বাস্তবায়নে এই যে একনিষ্ঠতা, তা আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন সেই নতুন সংগ্রামের সফল পরিণতির অপেক্ষায়।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search