সম্পাদকীয়

ব্লু-ইকোনমি ও জ্বালানি নিরাপত্তা: সমুদ্রের জট খোলার চ্যালেঞ্জ ও আগামীর রূপরেখা

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বর্তমান সরকারের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান দেশের ভঙ্গুর জ্বালানি খাত ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পদক্ষেপ। রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হোসেন মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্য দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার এক নতুন রোডম্যাপ উন্মোচন করেছে।

বিগত সরকারের আমলে সমুদ্র বিজয়ের চটকদার স্লোগান ও রাজনৈতিক প্রচারণায় যতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সমুদ্রের তলদেশ থেকে প্রকৃত সম্পদ আহরণে ততখানিই চরম উদাসীনতা দেখানো হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পেয়ে আমদানিনির্ভর এলএনজি ও জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা তৈরি হয়, যা দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আশঙ্কাজনক তলানিতে এনে ঠেকিয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক জট খুলে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে সমুদ্রে অনুসন্ধানের উদ্যোগ তাই একটি সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হোসেন মাহমুদের একটি উক্তি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য: “দেশের সম্পদ মাটির নিচে রেখে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ায় অনেক ক্ষতি হয়েছে।” বিগত দেড় দশকে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ভারতের সাথে ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সাথে ১ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা অর্জিত হলেও, সেই ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা সুনীল অর্থনীতি থেকে এক ফোঁটা গ্যাসও তুলতে না পারা ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চরম নীতিগত ব্যর্থতা। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো ঠিকই একই সমুদ্র ব্লক থেকে গ্যাস আবিষ্কার করে নিজেদের শিল্প ও অর্থনীতি সচল রাখছে।

দেশের ভেতরে তীব্র গ্যাস সংকটে যখন কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন চড়া মূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করে অর্থনীতিকে পঙ্গু করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের এই দরপত্র আহ্বান সেই ভুল এবং আত্মঘাতী নীতি থেকে বের হয়ে আসার এক সাহসী প্রয়াস।

গত বছর সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ জমা দেয়নি—জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের এই তথ্যটি প্রমাণ করে যে, পূর্বের উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।

বর্তমান সরকার গত এক বছর ধরে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা করে এবং কোম্পানিগুলোর আপত্তি ও মতামত আমলে নিয়ে ‘পিএসসি ২০২৬’ সংশোধন করেছে, যা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি কূটনৈতিক ও কারিগরি পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য কিছু যুক্তিযুক্ত সুবিধা বাড়িয়ে এবং অতীতের ত্রুটিবিচ্যুতি দূর করে এবারের দরপত্রকে যেভাবে অংশগ্রহণমূলক করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা বিনিয়োগের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানিগুলো যখন কোনো দেশে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে, তখন তারা সবার আগে খোঁজে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি স্বচ্ছ, নির্বাচিত সরকার। জ্বালানি মন্ত্রী সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের ওপর জনগণের যেমন আস্থা আছে, ঠিক তেমনি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি একটি বড় আস্থার জায়গা।

গত বছরের অনির্বাচিত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পরিবেশ কাটিয়ে এখন দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘চমক হলো বিএনপি সরকার’ মন্ত্রীর এই রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে দলটির অতীত ট্র্যাক রেকর্ড ও দেশের সম্পদকে দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার মৌলিক নীতি।

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বড় বিতর্কটি সব সময় তৈরি হয় ‘পিএসসিতে দেশের হিস্যা’ বা মালিকানা নিয়ে। মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী উভয়েই দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না করে এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে এই চুক্তি সম্পাদন করা হবে।

আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে দেশের প্রাপ্য অংশ বা সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেওয়া হবে। দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায় যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কোনো ধরনের অনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করাই হবে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী দিনের প্রধান পরীক্ষা। অতীতে চারটি কোম্পানি কাজ শেষ না করে চলে যাওয়ার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা মাথায় রেখে এবার কোম্পানিগুলোর কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।

উপসংহারে বলা যায়, ছয়টি জাতীয় দৈনিক এবং বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে এই দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ প্রমাণ করে যে সরকার অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে এই প্রক্রিয়াটি শুরু করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের জোর দেওয়ার বিষয়টিও প্রশংসনীয়, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নে সাহায্য করবে। তবে মনে রাখতে হবে, সমুদ্রের গভীর জলভাগে অনুসন্ধান একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া।

আজ যে জট খুলেছে, তার সুফল পেতে হলে সরকারকে প্রতিটি পদক্ষেপে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। আমরা আশা করি, এই আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে বিপুল তেল-গ্যাস আবিষ্কৃত হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে, শিল্পের চাকা সচল রাখবে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

Related News

রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, নব দিগন্তের সূচনা ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ, শুভেচ্ছা জ্ঞাপন এবং সংবিধান অনুযায়ী সুশাসন ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে শুভকামনা ও প্রত্যাশার সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

স্বাস্থ্যগত কারণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ, স্পিকারের প্রত্যাবর্তন এবং সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাইলস্টোন ট্রাজেডির এক বছর, বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় সুরক্ষার শিক্ষা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মাইলস্টোন ট্রাজেডির এক বছর পূর্তিতে তারেক রহমান ও জুবায়দা রহমানের উক্তি বিশ্লেষণ এবং অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

ফ্যামিলি কার্ডের দেশব্যাপী সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছ ডেটাবেজ তৈরীতে গুরুত্ব দিতে হবে : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণের উদ্যোগ ও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসান কমানো ও টেকসই উন্নয়নের রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৮৮৯ কোটি টাকা লোকসানের কারণ বিশ্লেষণ এবং রেলের আয় বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

শব্দ ও বায়ু দূষণের মহাবিপর্যয় রোধে চাই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকা শহরের ভয়াবহ শব্দ ও বায়ু দূষণের বর্তমান পরিমাণ, পেছনের প্রধান কারণসমূহ এবং এই মহাবিপর্যয় রোধে কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন তা নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয়।

দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও পরিকল্পিত রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭ লাখ মানুষের পুনর্বাসন ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার প্রতিরোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমাদের প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং। আরবি হরফ লেখা পতাকা, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ ও শহীদদের তালিকা নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search