জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।
যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং তাদের জনসম্পৃক্ত প্রতিবাদ একটি স্বাভাবিক ঘটনা। সরকার গঠন বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ১১-দলীয় ঐক্যের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার রাজনৈতিক তৎপরতা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে রাজনৈতিক কৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণের সময় দেশের সার্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে চলমান জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপকে আমলে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা ও সিলেট অভিমুখে শত শত যানবাহন নিয়ে চার বিভাগে লংমার্চ এবং বিশাল মহড়া কতটুকু জনবান্ধব বা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিপালন করতে গিয়ে যদি জাতীয় সম্পদের অপচয় হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে, তবে তা বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
বিশ্বজুড়ে চলমান সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের কারণে দেশ আজ এক কঠিন সময় পার করছে। এ অবস্থায় প্রতিটি লিটার জ্বালানি তেল ও গ্যাস জাতীয় সুরক্ষার মূল উপাদান।
বিভাগীয় শহরগুলোতে শত শত গাড়ি ও যানবাহনের লংমার্চে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ব্যবহার হবে। সংকটকালে এই বিপুল শক্তির অবক্ষয় জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। রাজপথে গাড়ি নিয়ে মহড়া না দিয়ে সভা-সমাবেশ, মানবিক সহায়তা কেন্দ্র গঠন, স্থানীয় পর্যায়ে জনসংযোগ এবং সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে সরকারের নীতি ও ভুলের সমালোচনা করা অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে।
গণতন্ত্র কেবল রাজপথের শোরগোল বা ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং জাতীয় সংকটে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পদ সুরক্ষায় সরকারকে সহযোগিতা করাই আসল রাজনীতি।
এনসিপি ইতোমধ্যেই সংসদে জাতীয় নানা বিষয়ে কথা বলছে। জাতীয় সংসদকে মূল কেন্দ্রবিন্দু করে সেখানে অর্থপূর্ণ আলোচনা, জনসম্পৃক্ত ইস্যু ও সুনির্দিষ্ট বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ফলপ্রসূ হবে। রাজনীতিবিদদের আচরণ ও কর্মসূচিই জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছায়।
বিরোধী দল যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের লংমার্চ স্থগিত করে কিংবা যানবাহন সীমিত করে পরিবেশ ও সম্পদ রক্ষার বার্তা দেয়, তবে তা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিপক্কতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা বা ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোর রাজনৈতিক মহড়া সংকটকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এনসিপি এবং ১১-দলীয় ঐক্য সরকারবিরোধী রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায় ঠিকই, তবে তা হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ ও সম্পদের ভারসাম্য বজায় রেখে। দেশের বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে শত শত গাড়ি নিয়ে লংমার্চের তেল-গ্যাস অপচয় বন্ধ করে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ প্রদর্শন করাই সময়োপযোগী পদক্ষেপ হবে।
রাজনৈতিক শক্তির মূল পরিচয় ফুটে ওঠে কেবল রাজপথের শক্তিতে নয়, বরং সংকটকালীন সময়ে দেশের সার্বভৌম স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।