সম্পাদকীয়

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপির পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতের ঋণের এক-তৃতীয়াংশই এখন অকার্যকর এবং আমানতকারীদের এই বিপুল অর্থ চরম ঝুঁকিতে।

চলতি বছরের জুন প্রান্তিক পর্যন্ত কেবল তিন মাসের ব্যবধানে নতুন করে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ যুক্ত হওয়া প্রমাণ করে যে, সংকটটি আর সাধারণ কোনো মন্দা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও পুঞ্জীভূত কাঠামোগত দুর্বলতার এক করুণ পরিণতি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের ভুয়া, বেনামি ও রাজনৈতিক প্রভাবে বিতরণ করা ঋণের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করায় এই পরিসংখ্যান লাফিয়ে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া নিয়মিত সুদ যুক্ত হওয়ার ব্যাখ্যার বাইরে বাস্তব সত্য হলো, অতীতে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রদত্ত অযোগ্য ও ভুয়া ঋণই আজকের প্রধান সংকট।

এস আলম গ্রুপ ও অন্যান্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সংহত ইসলামী ব্যাংকগুলো (যেমন—সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও এক্সিম ব্যাংক) এবং বেসিক, জনতা, এবি ও পদ্মা ব্যাংকের খেলাপির হার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

সাবেক অর্থমন্ত্রীর উত্থাপিত শীর্ষ ২০ খেলাপির মধ্যে ১১টিই একক একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়া প্রমাণ করে, কীভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতকে নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রুপের হাতে জিম্মি করা হয়েছিল।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তন করে কাগজ-কলমে খেলাপি কমানোর চেষ্টা করা হলেও তা মূল সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্নে নেমে যাওয়া এবং তীব্র তারল্য সংকট কাটানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পুনঃতফসিলের নীতিগত সুবিধার পাশাপাশি অর্থ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে।

ঋণ জালিয়াতির সাথে জড়িত মূল সুবিধাভোগী ও তাদের সহায়তা করা ব্যাংকারদের আইনি আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও অর্থ আদায়ের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে।

ব্যাংকিং খাত হলো একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ব্যাংকগুলোতে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত আমানত সুরক্ষা দেওয়া এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টানা ছাড়া জাতীয় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা অসম্ভব। কাগজে-কলমে ছাড় দিয়ে খেলাপি কম দেখানোর পুরনো রাজনৈতিক কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আমানতকারীদের আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Related News

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী -ঐতিহ্য, সংহত অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের রূপরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় উন্নয়ন, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার বিশেষ সম্পাদকীয়।

গুমের অন্ধকার থেকে ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস, গুম তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট, তারেক রহমানের অনুভূতি এবং গুম প্রতিরোধ আইনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক আধুনিকায়ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

রাজধানী ঢাকা আজ যেন এক অচল স্থবির নগরী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থেকে কোটি কোটি মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, তা অনস্বীকার্য। মেগা প্রজেক্ট ও ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলেও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলার অভাবে এই যানজট নিরসনে কার্যকর কোনো ফলাফল দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক সদিচ্ছায় সম্ভব সহিংসতামুক্ত স্থানীয় নির্বাচন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর বক্তব্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা রোধ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তি, নদীর নাব্য সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা: আতাউর রহমান মিন্টু

এই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপগুলোর দ্রুত ও তদারকিভিত্তিক বাস্তবায়ন জলবায়ু সংকটের চরম ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশকে একটি ডাইনামিক, জলবায়ু-সহনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি বিশিষ্ট রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

ইইউ-বাংলাদেশ নতুন অংশীদারিত্ব, অনুদান থেকে বাণিজ্য ও টেকসই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বার্তা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্য, ইইউ-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক নতুন সম্পর্ক, বিনিয়োগ ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের উদ্যোগ প্রশংসনীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে চীনের তৈরি জে-১০সিই ফাইটার জেট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ড্রোন ক্রয়ের প্রক্রিয়ার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search