শব্দ ও বায়ু দূষণের মহাবিপর্যয় রোধে চাই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
ঢাকা শহরের ভয়াবহ শব্দ ও বায়ু দূষণের বর্তমান পরিমাণ, পেছনের প্রধান কারণসমূহ এবং এই মহাবিপর্যয় রোধে কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন তা নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয়।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক খতিয়ান বাংলাদেশ রেলওয়ের সামগ্রিক সক্ষমতা এবং এর কাঠামোগত দুর্বলতার এক মিশ্র চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। গত এক বছরে রেলওয়ের বার্ষিক আয় আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
বিশেষ করে যাত্রী খাতে ২৫৬ কোটি টাকার রেকর্ড রাজস্ব বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের কাছে এখনো গণপরিবহন হিসেবে রেলের গ্রহণযোগ্যতা কতখানি। কিন্তু এই দৃশ্যমান সাফল্যের সমান্তরালে ১ হাজার ৮৮৯ কোটি টিরও বেশি টাকার বিশাল অঙ্কের নিট লোকসানের পরিসংখ্যানটি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে যেখানে পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা, সেখানে কেবল সাময়িক সংস্কার নয়, বরং আমূল পরিবর্তনের একটি জাতীয় এজেন্ডা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পেনশন খাতে ব্যয় হয়, যা মূল পরিচালন ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত করা সমীচীন নয়। এই ব্যয় বাদ দিলে অপারেটিং রেশিও ২.০৯ থেকে কমে ১.৪৩-এ নেমে আসে এবং ঘাটতি দাঁড়ায় ৮৮৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
একই সাথে, ২০১৬ সালের পর দীর্ঘ এক দশকেও রেলের ভাড়া বৃদ্ধি না করা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের আকাশচুম্বী মূল্যের প্রেক্ষাপটে একে কেবল একটি ‘লোকসানি ’ হিসেবে দেগে দেওয়া অন্যায় হবে। রেলওয়ে মূলত একটি রাষ্ট্রীয় সেবা খাত, যার উদ্দেশ্য কেবল মুনাফা অর্জন নয়, বরং সুলভে জনসেবা নিশ্চিত করা।
তবে সেবার নামে বছরের পর বছর বিশাল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির এই সংস্কৃতিকেও অনন্তকাল টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। রেলকে একটি স্বাবলম্বী, আধুনিক ও গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু সমন্বিত ও বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বের যেকোনো দেশের রেলওয়ের আয়ের মূল উৎস হলো পণ্য পরিবহন বা কার্গো সেক্টর। অথচ বাংলাদেশ রেলওয়ের চিত্র উল্টো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে মালামাল পরিবহন খাতে আয় কমেছে ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
এই অচলাবস্থা দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ও শক্তিশালী লোকোমো(ইঞ্জিন) আমদানি করতে হবে। একই সাথে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সাথে সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপন করে দ্রুত পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পণ্য পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন করতে পারলে রেলের রাজস্ব আয় রাতারাতি দ্বিগুণ করা সম্ভব।
ট্রেনের ইঞ্জিন ও রোলিং স্টকের সংকট নিরসন: যাত্রী চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ইঞ্জিন এবং আধুনিক বগির (কোচ) অভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন রুট চালু করতে পারছে না এবং অনেক শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। পুরাতন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নতুন রোলিং স্টক যুক্ত করতে হবে।
রেলে নিজস্ব আধুনিক ওয়ার্কশপ বা কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে করে বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই ছোটখাটো যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা যায়।
ভাড়ার যৌক্তিক পুনর্নির্ধারণ ও বৈচিত্র্যকরণ: বিগত ১০ বছর ধরে রেলের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি, যা বর্তমান বাজার মূল্যের সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। সাধারণ মানুষের সামর্থ্য বিবেচনা করে সুলভ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাড়া সামান্য বৃদ্ধি করে, এসি, বার্থ বা বিলাসবহুল শ্রেণীর ভাড়া অন্যান্য বেসরকারি পরিবহনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক হারে বাড়াতে হবে।
একই সাথে অফ-পিক আওয়ার (যখন যাত্রী কম থাকে) এবং পিক-আওয়ারের জন্য আলাদা ভাড়ার কাঠামো (ডাইনামিক প্রাইসিং) প্রবর্তন করা যেতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী একটি সফল মডেল।
বাংলাদেশ রেলওয়ের দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, যার একটি বড় অংশ বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভূ-সম্পত্তি খাতে মাত্র ৩ কোটি টাকা এবং অপটিক্যাল ফাইবার লিজ থেকে ১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা বেশি আয় হয়েছে, যা এর প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় অতি সামান্য। রেলের এই বিশাল ল্যান্ড ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলের মাধ্যমে বাণিজ্যিক হাব, শপিং মল, আধুনিক লজিস্টিক পার্ক বা গুদামঘর নির্মাণ করে স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে।
অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ককে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে আরও বড় পরিসরে লিজ দিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
লিজ ব্যবস্থা ও বিবিধ উৎসের অনিয়ম দূরীকরণ: গেল অর্থবছরে পরিবহন ও বাণিজ্যিক খাতে ভেন্ডিং লাইসেন্স এবং বিবিধ উৎস থেকে মোট আয় কমেছে প্রায় ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এটি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাবকে নির্দেশ করে। ট্রেনের খাবার সরবরাহ (ক্যাটারিং), প্ল্যাটফর্ম পার্কিং, ও ভেন্ডিং লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে হবে।
ই-টেন্ডারিং এবং কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে হবে।
রেলওয়ের টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর ও ওয়ান-স্টপ সলিউশনে রূপান্তর করতে হবে। টিকিট কালোবাজারি রুখতে জাতীয় পরিচয়পত্র ভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা আরও জোরদার করা এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বিবেচনা করা যেতে পারে। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে ডিজিটাল ডিসপ্লে, প্রতিটি স্টেশনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন লাউঞ্জ এবং চলন্ত ট্রেনে নিরবচ্ছিন্ন ওয়াই-ফাই সেবা প্রদান করা দরকার।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ রেলওয়েকে কেবল একটি লোকসানি সরকারি দপ্তর হিসেবে টিকিয়ে রাখার মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। সঠিক নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করলে এই সংস্থাকে দেশের সবচেয়ে লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনে রূপান্তর করা অসম্ভব কিছু নয়।
সরকার যেভাবে মেগা প্রকল্পগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছে, ঠিক একইভাবে যদি এর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা দক্ষতা এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় নজর দেয়, তবেই বাংলাদেশ রেলওয়ে স্বমহিমায় ঘুরে দাঁড়াবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।