বিশ্ব

সমাজতন্ত্রের পরীক্ষা ও চীনের পথচ্যুতি: অ্যান্ড্রু ওয়াল্ডারের আলোতে মাও-যুগ

মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু জি ওয়াল্ডারের কালজয়ী গবেষণাগ্রন্থ ‘China Under Mao: A Revolution Derailed’-এর আলোকেই মূলত ১৯৪৯ সালে গণচীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭৬ সালে মাও সে-তুংয়ের মৃত্যু পর্যন্ত চীনা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের বৈপ্লবিক উত্থান-পতন, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যায়।
ওয়াল্ডারের মতে, ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতায় আসা বিপ্লবের সমাপ্তি ছিল না, বরং এটি ছিল এক দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার সূচনা।
১৯৪৯ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত চীনের শাসনভার গ্রহণের পর মাও সে-তুংয়ের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল সুবিশাল এক জনসংখ্যা ও দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করা। প্রাথমিক পর্যায়ে মাও দুটি মূল স্তম্ভের ওপর ভর করে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেন:
পার্টির কঠোর একক নিয়ন্ত্রণ: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত করা হয়।
সোভিয়েত ভাবধারার পরিকল্পিত অর্থনীতি: ভূমিসংস্কার, শিল্পের জাতীয়করণ এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা জোরদার করা হয়।
এই কাঠামো দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তর আনলেও পরবর্তীতে ভুল নীতি শুধরে নেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ কমিয়ে দেয়।
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্টালিন-পরবর্তী নতুন নেতৃত্বের নীতি ও আদর্শগত পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয় বিখ্যাত ‘সিনো-সোভিয়েত বিরোধ’ (Sino-Soviet Split)। মাও ধারণা করেন মস্কো আসল সমাজতন্ত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
১৯৫৬ সালে মাও বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্য ‘শত ফুল ফুটুক’ (Hundred Flowers Campaign) নীতি ঘোষণা করলেও, উন্মুক্ত সমালোচনা তীব্র হলে তিনি দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করেন। শুরু হয় ‘ডানপন্থাবিরোধী অভিযান’ (Anti-Rightist Campaign), যার মাধ্যমে সামাজিক উদারতার পথ রুদ্ধ করে পুনরায় উগ্র শ্রেণিসংগ্রামকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা হয়।
কৃষিনির্ভর চীনকে রাতারাতি শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরের উদ্দেশ্যে ১৯৫৮ সালে চালু করা হয় ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ (Great Leap Forward)।
কঠোর গৃহস্থালি নিবন্ধন ব্যবস্থা (হুকৌ / Hukou) প্রয়োগ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে কৃষিজমিতে আটকে রাখা হয়, যাতে শহরের জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। তথ্য গোপন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফলে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চীনে এক ভয়াবহ ঐতিহাসিক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যেখানে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারান।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর লিউ শাওছি ও দেং শিয়াওপিংরা কিছুটা বাস্তবমুখী সংস্কারে নামলে মাও মনে করেন পার্টিতে ‘পুঁজিবাদী ধারা’ ঢুকে পড়েছে। ফলস্বরূপ ১৯৬৬ সালে তিনি তরুণদের সংগঠিত করে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ (Cultural Revolution) শুরু করেন।
পর্ব ঘটনা ও প্রভাব
প্রাথমিক পর্ব (১৯৬৬-১৯৬৭) রেড গার্ডদের অরাজকতা, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী নিধন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ।
সামরিক নিয়ন্ত্রণ (১৯৬৮-১৯৭১) পরিস্থিতি সামলাতে লিন বিয়াওর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ; প্রায় ১১-১৬ লাখ মানুষের প্রাণহানি।
চূড়ান্ত পরিণতি মাওয়ের রাজনৈতিক উত্তরসূরি লিন বিয়াওর রহস্যজনক পতন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষাঘাতগ্রস্ততা।
মাওয়ের শাসনামলে তাঁর রচিত ‘লিটল রেড বুক’ এবং তাঁর সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক সত্যের একমাত্র মানদণ্ডে পরিণত হয়েছিল। এতে করে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পৌঁছানোর পথ বন্ধ হয়।
তবে ওয়াল্ডারের মতে, ইতিহাসকে কেবল ব্যর্থতার গল্পে সীমাবদ্ধ করা অসমীচীন। মাও-যুগের কিছু মৌলিক অর্জনও চীনকে পরবর্তীতে বিশ্বশক্তিতে রূপান্তরে সাহায্য করেছিল:
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় সত্তা তৈরি।
শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং ব্যাপক সামাজিক রূপান্তরের মাধ্যমে নারী অধিকার ও গ্রামীণ কাঠামোর অগ্রগতি।
আধুনিক শিল্পায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি নির্মাণ।

 

১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর এবং ‘গ্যাং অব ফোর’ গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। ১৯৮১ সালে দেং শিয়াওপিংয়ের অধীনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি মাওয়ের অবদানকে ‘৭০ শতাংশ ভালো ও ৩০ শতাংশ ভুল’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়িত করে।
অ্যান্ড্রু ওয়াল্ডারের দৃষ্টিভঙ্গিতে, চীনের বিপ্লব শুধু ব্যর্থ হয়নি; বরং যে শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো মাও তৈরি করেছিলেন, সেই রাষ্ট্রে নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক পথ না থাকায় বিপ্লব শেষ পর্যন্ত নিজ পথ থেকে বিচ্যুত বা ‘ডিরেইলড’ হয়ে পড়েছিল।

Related News

চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত লুলা ডা সিলভা

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রানঅফ নির্বাচনে ফ্লাভিও বলসোনারুকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত লুলা ডা সিলভা।

টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সাক্ষাৎ

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত করেছে সংসদীয় মৈত্রী লীগ। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশাবাদ।

ভানুয়াতুর উপকূলে ৭.২ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে ৭.২ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করেছে আন্তর্জাতিক সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক জাহাজ ঢুকতে দেওয়া হবে না: ইরান

কোনো পরিস্থিতিতেই মার্কিন সামরিক জাহাজকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিল ইরান। হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে উত্তেজনা।

টাইফুন চাম্পির আঘাতে অচল তাইওয়ান, নিরাপদ আশ্রয়ে সহস্রাধিক মানুষ

তাইওয়ানে সুপার টাইফুন চাম্পির প্রভাবে বিমান চলাচল বন্ধ, নিহত ১। নিরাপদে সরানো হয়েছে ১,১০০ মানুষকে।

যুদ্ধবিরতি নয়, ইউক্রেনের সঙ্গে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে রাজি রাশিয়া: পুতিন

ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় প্রস্তুত রাশিয়া। তবে সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি চান প্রেসিডেন্ট পুতিন।

ত্রিপক্ষীয় আলোচনা পুনরায় শুরু করতে রাজি রাশিয়া, চুক্তির বিষয়ে সংশয়

মার্কিন দূতের সাথে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সাথে আলোচনায় প্রস্তুত রাশিয়া, তবে শান্তি চুক্তি নিয়ে সংশয়।

দারিদ্র্য দূরীকরণে সাশ্রয়ী আবাসন ও আর্থিক কাঠামো সংস্কারের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের

আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক কাঠামো সংস্কারের আহ্বান জানান।

Search