বাংলাদেশকে একটি বৈষম্যহীন ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভূমিকা অপরিসীম। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি—’ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির দেশব্যাপী পর্যায়ক্রমিক সম্প্রসারণের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক।
অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি প্রমাণ করে যে, দেশের সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার কতটা আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ধাপে ধাপে এই কার্ড বিতরণ কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার যে বাস্তবসম্মত রূপরেখা তৈরি হচ্ছে, তা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা কার্যকর, স্বচ্ছ ও নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার ওপর যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শী। অতীতে দেখা গেছে, যথাযথ এবং আধুনিক ডেটাবেজের অভাবে অনেক সময় প্রকৃত দুস্থ ও অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিকেরা সামাজিক নিরাপত্তার আওতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এক শ্রেণীর অসাধু চক্র সেই সুবিধার অপব্যবহার করেছে।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং উপকারভোগী নির্বাচনপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার এই নির্দেশনা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তবে এই ধরনের একটি বিশাল মেগা-কর্মসূচি দেশব্যাপী সফলভাবে বাস্তবায়ন করা কেবল একটি একক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক উইংয়ের মধ্যে একটি সুদৃঢ় ও কার্যকরী সমন্বয় থাকতে হবে। প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে নিখুঁত তালিকা প্রণয়ন করাই হবে এই প্রকল্পের মূল চ্যালেঞ্জ।
এই ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি ডিজিটাল ভেরিফিকেশন (যেমন—জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID যাচাইকরণ) প্রক্রিয়াকে আরও নিখুঁত করতে হবে।
আমরা আশা করি, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম কেবল একটি সাময়িক ত্রাণ সহায়তা বা নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে থাকবে না; বরং এটি যেন দেশের প্রতিটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে।
একটি দুর্নীতিমুক্ত, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উদ্যোগ সফল হলে, তা দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে প্রমাণিত হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক গবেষক।