আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরা দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ট্রাজেডির সৃষ্টি হয়েছিল, তা দেশের ইতিহাসে এক গভীর ও করুণ ক্ষত তৈরি করে রেখে গেছে।
এই মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় ২৮ জন মাসুম শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং বৈমানিকসহ মোট সাঁইত্রিশটি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়। ট্রাজেডির এক বছর পূর্তিতে আজ কেবল স্বজনহারা পরিবারগুলোর অশ্রুপাত নয়, বরং এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামরিক আধুনিকায়নের সার্বিক পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব, পাইলটের সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস বা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক সচেতনের ঘাটতি এবং কারিগরি তদারকির ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি মাত্র একটি প্রবেশপথ থাকা ভবনটিতে আছড়ে পড়েছিল।
এটি খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে—ঘোলাটে ও ঘনবসতিপূর্ণ আকাশসীমায় পুরনো প্রজন্মের বিমান নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মহড়া চালানো এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কত বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মাইলস্টোন ট্রাজেডির এই কালো বর্ষপূর্তিতে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উক্তি ও অবস্থান জাতির জাতীয় অনুভূতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষয়ক্ষতির পরপরই গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, *“একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—যেখানে একটি শিশু বা তরুণ তার শিক্ষা, বিকাশ ও নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠে, সেই পরিবেশে এমন ভয়াবহতা কখনো কাম্য নয়।”
তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উন্নত চিকিৎসা ও স্থায়ী সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার অঙ্গীকার জানান।
জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী ডা. জুবায়দা রহমান বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, “দুর্দশাগ্রস্ত সেই সময়ে পুরো দেশ ও বিশ্ব যে সাহস, সহানুভূতি ও ত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত দেখেছে—তা ইতিহাসে বিরল। ‘মানুষ মানুষের জন্য’—মানবতার আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে এই বিপদে এগিয়ে আসার স্পৃহায়।”
তিনি স্বজনহারাদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে এই শোককে শক্তিতে পরিণত করার আহ্বান জানান।
মাইলস্টোন ট্রাজেডির শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রসঙ্গে জাইমা রহমানও বারবার মানবতার হাত বাড়াতে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
মাইলস্টোনের মতো নির্মম দুর্ঘটনার পুনর্ব্যক্তি রোধ করতে হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে ঢেলে সাজানো এবং সময়োপযোগী আধুনিকায়ন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লিটে থাকা পুরাতন প্রজন্মের (যেমন পুরোনো এফ-৭ সিরিজ) প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানগুলোকে পর্যায়ক্রমে অবসর দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ফোর-প্লাস বা ফিফথ জেনারেশন ট্রেনার্স ও মাল্টিরোল ফাইটার এয়ারক্রাফট অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ঢাকা বা উত্তরার মতো ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার ঠিক পাশ থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণ ও টেক-অফের মহড়া বন্ধ করতে হবে। এয়ারবেস বা প্রশিক্ষণের জন্য জনবসতি থেকে অনেক দূরে উপকূলীয় বা নির্জন স্থান নির্ধারণ করা সময়ের দাবি।
তদন্ত রিপোর্টে উঠে আসা ‘ইনসাফিসিয়েন্ট ট্রেনিং’ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি দূর করতে ভার্চুয়াল সিমুলেটর ভিত্তিক মহড়া বাড়াতে হবে। জরুরি অবস্থায় জনবহুল স্থান এড়িয়ে ইজেক্ট করা বা জরুরি অবতরণের জন্য পাইলটদের সর্বোচ্চ মানসিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি নিশ্চিত করা দরকার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যেকোনো বহুতল পাবলিক ভবনে ইমার্জেন্সি এক্সিট ও ফায়ার সেফটি বাড়াতে হবে। মাইলস্টোনের ভবনে কেবল একটি সিঁড়ি থাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছিল—যা দেশের সব প্রতিষ্ঠানের স্থাপত্য নকশার জন্য এক বড় শিক্ষা।
পরিশেষে, মাইলস্টোন ট্রাজেডির শহীদের প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা তখনই নিবেদিত হবে, যখন আমরা তাদের রক্তের মূল্যে শেখা শিক্ষাগুলোকে জাতীয় নীতিতে রূপান্তর করতে পারব। উন্নত ও আধুনিক বিমান বাহিনী গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে তবেই ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের কোল খালি হবে না।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক গবেষণক।