বৈশ্বিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কেবল প্রথাগত সাহায্য ও বাণিজ্যনির্ভর সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন একটি কৌশলগত বহুমুখী অংশীদারিত্বের দিকে দ্রুত গতিতে ধাবিত হচ্ছে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় আয়োজিত আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের (এআরএফ) শীর্ষ বৈঠকের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কাজা কালাসের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা তারই এক স্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সংস্থার রূপান্তর এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই পক্ষের ঐক্যমত বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির এক বিরাট কূটনৈতিক সাফল্যকে নির্দেশ করে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের উপস্থিতি সমন্বিত এই বৈঠকের গুরুত্বকে আরও বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন হলো বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় অংশীদার। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণ বা গ্র্যাজুয়েশনের পটভূমিতে ইউরোপের বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের যে তাগিদ রয়েছে, তা বাস্তবায়নে এই কৌশলগত সংলাপ সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করবে।
ম্যানিলার বৈঠকের ফলাফলের আলোকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার যৌথ সহযোগিতার প্রধান দিকগুলো নিম্নে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল একটি বাণিজ্যিক জোট নয়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ও অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ স্তম্ভ। অর্থনৈতিক উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ ফলপ্রসূ আলোচনা করেছে।
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নানাবিধ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের ভূমিকা ও সংস্কারের গুরুত্ব অর্জনে দুই দেশই সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেছে। বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখার পক্ষে উভয় পক্ষের সুদৃঢ় সমর্থন বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকের মানবিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের নিজ দেশে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক চাপ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নীতি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কৌশলগত অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও জিএসপি সুবিধা পুনর্মূল্যায়ন।
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা জাতিসংঘের প্রশাসনিক সংস্কার ও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহুপক্ষীয় নীতি জোরদার। আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক জোটে যৌথ অংশগ্রহণ।
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মিয়ানমারে দ্রুত, নিরাপদ ও সম্মানজনক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ইইউ-এর পূর্ণ সমর্থন। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ প্রয়োগ বজায় রাখা।
পরিশেষে বলা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য তৈরি। বর্তমান বিশ্বের বহুমাত্রিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যেও ইইউ-এর মতো একটি প্রভাবশালী ব্লকের সাথে কৌশলগত বোঝাপড়া বজায় রাখা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের জন্য এক আশীর্বাদ।
সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং সময়োপযোগী এই পদক্ষেপ ইউরোপের সাথে আগামী দিনের বাণিজ্যিক ও মানবিক সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও শক্ত করবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক সাফল্য দেশের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এক নতুন যুগের সূচনা করবে—এটাই আমাদের বিশ্বাস।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।