ফিচার ডেস্ক: ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) উদ্ভিদ-উদ্যান এবং জার্মপ্লাজম সেন্টারে দুই দশকের বেশি সময় ধরে আসা-যাওয়ার সূত্রে উদ্ভিদকুলের সঙ্গে এক দারুণ সখ্য গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি জার্মপ্লাজম সেন্টারে ফলবৈচিত্র্যের হালনাগাদ তথ্য জানতে গিয়ে সেখানে দেখা মিলেছে এমন দুটি ফল বা সবজির, যার নাম অনেকে শুনলেও সচরাচর ছবি দেখেননি। এই দুটি আকর্ষণীয় ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফল হলো— ‘তৈকর’ এবং ‘বনকাঁকরোল’।
বাকৃবির জার্মপ্লাজম সেন্টারের বাগানিদের সহায়তায় এই বিরল ফল দুটির উদ্ভিদের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। তবে গাছের ফলের উচ্চতা বেশি থাকায় এবং ক্যামেরা সংকটের কারণে গাছতলায় পড়ে থাকা ফলের ছবি তুলে সংগ্রহ করতে হয় এই তথ্য।
তৈকর: পুষ্টি ও ঔষধি গুণের এক অপ্রচলিত ফল
স্থানীয়ভাবে ‘তিকুল’ বা ‘তিকুর’ নামে পরিচিত তৈকর একটি মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ, যা ১৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর দেহকাণ্ড খাঁজকাটা এবং বাকল গাঢ় ধূসর থেকে গাঢ় বাদামি ও মসৃণ। এর পরিপক্ব ফল হলুদ রঙের ও রসালো হয়, যার ওজন প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি এবং এতে ৮ থেকে ১০টি রসালো বীজ থাকে।
তৈকর গাছ থেকে বছরে দুবার ফলন পাওয়া যায়। প্রথমবার আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি মাসে ফুল আসে। নভেম্বর-ডিসেম্বর এবং এপ্রিল-মে মাসে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। একটি পরিণত গাছে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ফল ধরে এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৭০ থেকে ৭৫ টন হতে পারে। বৃহত্তর সিলেটে এই ফলের বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। সেখানকার বিভিন্ন এলাকায় তরকারিতে কচি ফল ব্যবহারের পাশাপাশি আচার, জ্যাম ও জেলি তৈরি করে খাওয়া হয়। এমনকি কচি সবুজ ফল ফালি করে কেটে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণও করা যায়।
বৈজ্ঞানিক নাম Garcinia pedunculata হওয়া এই ফলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু চিরহরিৎ অরণ্যে জন্মে। বাংলাদেশে মূলত রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে এটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। ফলটি আঠা, রং এবং গৃহ নির্মাণ ও আসবাবের কাঠ তৈরিতেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৯৬ সালে ‘বারি তৈকর-১’ নামের একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এটি বিবিধ রোগ নিরাময় ও মুখে রুচি তৈরিতে দারুণ কার্যকরী।
বনকাঁকরোল: প্রায় বিলুপ্ত হতে চলা দানবাকৃতির সবজি
সাধারণ কাঁকরোলের মতোই দেখতে হলেও আকারে এর চেয়ে দ্বিগুণ বা তিন গুণ বড় হয় ‘বনকাঁকরোল’। একসময় গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতো এই লতানো উদ্ভিদ, যা বর্তমানে প্রাকৃতিক আবাসে প্রায় দুষ্প্রাপ্য। প্রতিটি বনকাঁকরোলের ওজন সাধারণত আধা কেজি বা তার বেশি হতে পারে। দেশি জাতের কাঁকরোলের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। প্রায় বিলুপ্তপ্রায় এই জাতটি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক চকরিয়া এলাকার ফাঁসিয়াখালী বনভূমিতে খুঁজে পেয়ে এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২২ জাতের কাঁকরোল সংরক্ষণ করলেও তাদের সংগ্রহে এই বড় জাতের বনকাঁকরোল নেই।
বৈজ্ঞানিক নাম Momordica cochinchinensis এই লতানো উদ্ভিদটি ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং বড় গাছে বেয়ে ওঠে। এর স্বাদ হালকা তেতো। রান্নার পাশাপাশি ক্যানডি ও জ্যাম তৈরিতে বনকাঁকরোল ব্যবহৃত হয়। এর বীজের চারপাশে থাকা লাল ও তৈলাক্ত শাঁস (অ্যারিল) বীজের সঙ্গেই রান্না করা হয়, যা ভারতের কিছু অঞ্চলে ‘জোই গ্যাক’ নামে পরিচিত এবং ভিয়েতনামে বিয়েসহ বিভিন্ন উৎসবে ঐতিহ্যের সাথে পরিবেশন করা হয়।