আসাদুজ্জামান শেখ, বাগেরহাট প্রতিনিধি।
শিশু ফাতেমার আশ্রয়স্থল ছিল মাজার। মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের হাত ধরেই চলছিল বেঁচে থাকার নিত্যদিনের সংগ্রাম। এমন অযত্ন অবহেলিত ফাতেমার জীবনে ঈদের আনন্দ আসতো প্রতিবেশীদের হাত ধরে। অনাথ ফাতেমার জীবনে মানুষের দান করা নতুন জামার আনন্দে এবারও ঈদ কেটেছে। তবে শেষবারের মতো। এক কুমিরের ভয়াল থাবা কেড়ে নিয়েছে ছোট্ট ফাতেমার জীবন। সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খান জাহান আলী মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামে ফাতেমা। অন্ধকার রাতে ওৎ পেতে থাকা কুমিরটি মুহূর্তেই তাকে টেনে নিয়ে যায় অতল গভীরে। চিৎকার শোনার পর মাজার কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় মানুষ উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর চারটি নৌকা নিয়ে সারারাত চলে রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি। অবশেষে মঙ্গলবার ভোর চারটা চল্লিশ মিনিটে উদ্ধার হয় ফাতেমার নিথর দেহ। স্থানীয়রা জানান, ফাতেমার মা মানসিক ভারসাম্যহীন এবং তার পিতৃ পরিচয়ও কারো জানা ছিল না। সমাজের দয়া আর ভালোবাসায় বড় হয়ে উঠছিল শিশু ফাতেমা। কিন্তু তার এমন করুণ পরিণতিতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে স্তব্ধতা ও গভীর শোকের ছায়া। ঘটনার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাত, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ তদারকি করেন। তবে এই মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘাট এলাকায় কোন নিরাপত্তা বেষ্টনি বা সতর্কবার্তা না থাকায় এর আগেও অনেকবার কুমিরের হামলায় আহত ও নিহত হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এক শ্রেণীর মাজার প্রেমী ও ভক্তদের কারণে প্রশাসন তেমন শক্ত অবস্থানও নিতে পারেনি। সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাত আশ্বাস দিয়েছেন, মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দিঘিতে কুমির রাখার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অবতারণা হয়েছে এটা আসলেই বেদনাদায়ক। আমরা মর্মাহত। তবে মর্মাহত এই কথা বলেই পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এর দায় আমাদেরকে নিতে হবে। আমরা যারা জনপ্রতিনিধি আছি। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই এখানে আমরা উপস্থিত হয়েছি। ডিসি মহোদয় এসেছেন, এসপি মহোদয় এসেছেন। ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে না হয়, এজন্য স্থায়ী এবং কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা সত্য যে, ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষা করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনিভাবে মানুষের নিরাপত্তাটা আরও বেশি জরুরি বলে মনে করি। এজন্য সমন্বয়ের মাধ্যমেই এক্সপার্ট যারা আছে, বন বিভাগ আছে, প্রশাসন আছে তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে এ ব্যাপারে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। যাতে করে এই ধরনের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে আমাদের এখানে না ঘটে।
তবে এই আশ্বাস ফাতেমাকে আর ফিরিয়ে দেবে না। ছোট্ট ফাতেমার নিথর দেহ যেন সমাজকে এই নির্মম সত্যটাই বুঝিয়ে দিয়ে গেল। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঐতিহ্য রক্ষার চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি।