এনসিটিবির ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে ৮৫ কোটি ঋণ
এনসিটিবির ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে ৮৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পর বিলের অর্থ অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের বিরুদ্ধে। বিষয়টি এনসিটিবিকে জানিয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক।
সারাদেশ: বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মুঠোফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনারসহ নানা বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো হচ্ছে। এসব বর্জ্যের পরিবেশসম্মত ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা এখনো সীমিত। ফলে অন্যান্য গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে এগুলো ফেলে দেওয়া হচ্ছে ভাগাড় ও ডাস্টবিনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু ও রাসায়নিক পদার্থ যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছাড়া পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে মাটি ও পানি দূষিত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে এসব দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তখন বছরে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হতো। এর মাত্র ৩ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত বা রিসাইক্লিং করা হতো। বাকি ৯৭ শতাংশের বড় অংশই বিভিন্ন ভাগাড়ে চলে যেত।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে বছরে প্রায় ৪৬ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে।
ই-বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার ফলে বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব পদার্থ মানুষের শ্বাসযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মূত্রতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও টেলিভিশনের মতো প্রচলিত ই-বর্জ্যের পাশাপাশি দেশে এখন সৌরবিদ্যুৎ খাতের বর্জ্যও নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
গত এক দশকে দেশে সোলার হোম সিস্টেম, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারিচালিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়েছে। এসব যন্ত্রের আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি বর্জ্য হিসেবে জমা হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশের ক্লাইমেট সেন্টারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে স্থাপিত সোলার পিভি সেল থেকে ভবিষ্যতে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে এসব বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা গেলে সেখান থেকে প্রায় ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিথিয়াম-আয়ন ও লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্যও বাড়ছে।
তবে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ, পরিবহণ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থাপনা এখনো গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ব্যাটারি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে গলিয়ে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করা হয়। এতে পরিবেশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
পরিবেশভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ ই-বর্জ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হয়। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, শহরতলির স্ক্র্যাপ মার্কেট এবং অস্থায়ী কারখানায় ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহের কাজ চলে।
এসব জায়গায় অনেক সময় খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, এসিড ব্যবহার কিংবা হাতুড়ি দিয়ে যন্ত্রাংশ ভেঙে ধাতু আলাদা করা হয়। এতে শ্রমিকরা সরাসরি বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন। একই সঙ্গে এসব প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন অবশিষ্ট পদার্থ মাটি ও পানিতে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার দৈনিক ইত্তেফাককে বলেছেন, বর্তমানে সিটি করপোরেশনে ই-বর্জ্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না; সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গেই তা ব্যবস্থাপনা করা হয়।
তবে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন একটি কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে রিসোর্স রিকভারি সেন্টার তৈরির চুক্তি করেছে বলে জানান তিনি।
প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি বা এমআরএফ প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য আলাদা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্লাস্টিক থেকে তেল, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার ও বায়োগ্যাস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বাড়লেও তা সংগ্রহ, পরিবহণ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ব্যবহার বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এসব বর্জ্যের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-বর্জ্যকে সাধারণ বর্জ্য থেকে আলাদা করে সংগ্রহের পাশাপাশি নিরাপদ রিসাইক্লিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ই-বর্জ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ধাতু ও অন্যান্য উপাদান সংগ্রহের জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গেলে ই-বর্জ্য যেমন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে পারে, তেমনি এর মধ্যে থাকা কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, তামাসহ মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধার করে অর্থনৈতিকভাবেও কাজে লাগানো সম্ভব।