সম্পাদকীয়

চুয়েট উপাচার্য নিয়োগ বিতর্ক ও সংকট : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে কোনো স্পষ্ট কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে অব্যাহতি দিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে স্থলাভিষিক্ত করাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে যে নজিরবিহীন অচলাবস্থা ও আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের অদূরদর্শিতাকেই প্রকাশ্যে এনেছে।

চার বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া একজন উপাচার্যকে দুই মাসের কম সময়ে সরিয়ে দেওয়ায় চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজ একযোগে সর্বাত্মক ‘শাটডাউন’ ও কর্মবিরতি পালন করছে, যার ফলে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

এমনকি নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে ঢোকার সুযোগ না দিয়ে শিক্ষার্থীদের ‘রেড কার্ড’ প্রদর্শন এবং অনলাইনে যোগদানের ঘটনাটি সার্বিক প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাকেই প্রতিফলিত করে।

ক্যাম্পাসের এই অস্থিরতার পেছনে মূল কারণ হলো সিদ্ধান্তের অস্বচ্ছতা, হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের যোগ্য শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি কেবল একটি উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মর্যাদা ও আস্থার প্রতীক।

৪ বছরের মেয়াদে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনে কেন পদচ্যুত করা হলো—শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকা শিক্ষার্থীদের মনে চরম সংশয় ও ক্ষোভ তৈরি করেছে।

স্থানীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, একজন গৃহীত ও সচল উপাচার্যকে কারণ ছাড়া সরিয়ে দেওয়া গোটা শিক্ষক সমাজের জন্য অপমানজনক। পাশাপাশি, স্বনামধন্য একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত যোগ্য অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও বহিরাগত শিক্ষক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন ও যোগ্যতাকে খাটো করে দেখার শামিল।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বারবার উপাচার্য ও শীর্ষ প্রশাসনিক পদে রদবদল কেবল সেশনের ক্ষতিই করে না, বরং দেশের প্রকৌশল শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ ধ্বংস করে দেয়।

ক্যাম্পাসের শত শত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের আন্দোলনের মুখে নতুন উপাচার্যের অনলাইনে যোগদান সম্পন্ন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। এই ধরনের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে যেকোনো রদবদলের ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনি কারণ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আস্থা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। হুটহাট প্রজ্ঞাপন জারি থেকে বিরত থাকতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তদারকি কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে চুয়েটের শিক্ষক সমিতি ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনায় বসে উদ্ভূত সংকট নিরসনে কার্যকর ও যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

উপাচার্য নিয়োগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য অধ্যাপকদের প্রাধান্য দেওয়া হলে শিক্ষাঙ্গনে বাহ্যিক চাপ বা অচলাবস্থার ঝুঁকি বহুগুণ কমে যায়।

আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সেশনজটের মুখে পড়বে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ক্লাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরীক্ষার পরীক্ষাগার বানানো উচিত নয়। দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চুয়েটের অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করা না গেলে তা জাতীয় প্রকৌশল শিক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যুক্তিসঙ্গত ক্ষোভ অনুধাবন করে দ্রুত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনি পুনর্মূল্যায়ন করবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Related News

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: বৈশ্বিক মঞ্চে সুশাসন, শান্তি ও টেকসই প্রগতির দৃপ্ত বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, জলবায়ু তহবিল, রোহিঙ্গা সংকট ও বিশ্বশান্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

সেন্ট পিটার্সবার্গে বাংলাদেশ-রাশিয়া চুক্তি: সাংস্কৃতিক কূটনীতির নতুন দিগন্ত

সেন্ট পিটার্সবার্গ কালচারাল ফোরামে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ বিস্তার ও অপ্রতিম ট্র্যাজেডি; সামাজিক অবক্ষয় রুখতে প্রশাসন ও রাষ্ট্রের জরুরি করণীয় : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা, ‘ক্রাইম সেটআপ’ গ্যাংয়ের তাণ্ডব, কিশোর গ্যাং বৃদ্ধির কারণ ও তা নিয়ন্ত্রণে সরকার ও প্রশাসনের করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিশ্ববাজারের অস্থিরতায় তেলের দাম বৃদ্ধি, সরকারের অবস্থান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের আয়ের পরিমাপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

শিশু অপ্রতিম হত্যা ও জননিরাপত্তার সংকট; প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নাকি সামাজিক অবক্ষয়?

অপ্রতিম হত্যা, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার ব্যবস্থার দুর্বলতা, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য ও জাতীয় অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাবের আশঙ্কা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতি, পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপ্রতিম হত্যার মূল কারণ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

কুমিল্লায় শিশু অপ্রতিম হত্যার বিচার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূরীকরণ ও শিশু হত্যা রোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের তাগিদে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ, অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search