প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ বার ভালোবাসার কথা বলেন রাশমিকা
বিয়ের পর সংসার জীবন, প্রেম এবং নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন দক্ষিণ ভারতীয় তারকা বিজয় দেবারাকোন্ডা ও রাশমিকা মান্দানা। আসছে তাঁদের নতুন ছবি ‘রানাবালি’। বিনোদন সংবাদ।
বিনোদন: তারকাদের বিয়ে, প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়ের খবরের পাশাপাশি শোবিজ তারকাদের বিচ্ছেদের খবরও নিয়মিত আলোচনায় আসছে। কোনো তারকা জুটির বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ্যে এলেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় নানা আলোচনা, স্মৃতিচারণ ও জল্পনা-কল্পনা।
সাম্প্রতিক সময়ে সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা প্রীতম হাসান এবং অভিনেত্রী শেহতাজ মুনিরা হাশেমের বিচ্ছেদের খবরও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৪ অক্টোবর রাতে এক যৌথ বিবৃতিতে নিজেদের বিচ্ছেদের কথা জানান তাঁরা। দীর্ঘ ১০ বছরের সম্পর্কের মধ্যে প্রায় চার বছর সংসার করেছেন এই তারকা জুটি।
তাঁদের বিচ্ছেদের খবর প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে ভক্তদের অনেকে পুরোনো ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে জুটিটির একসঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করছেন।
শোবিজে বিচ্ছেদের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। তবে গত কয়েক বছরে একের পর এক পরিচিত তারকা জুটির দাম্পত্য ভাঙনের খবর আলোচনায় এসেছে।
চলতি বছর সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান খান এবং রোজা আহমেদের বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ্যে আসে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জনের পর তাহসান তাঁদের আলাদা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে বিচ্ছেদের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ্যে আনেননি তিনি।
২০২৬ সালের মার্চে অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ ও নাট্যকার আবু সাইয়িদ রানার বিচ্ছেদের খবরও সামনে আসে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করে মৌসুমী জানিয়েছিলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার মতো অবস্থায় তিনি ছিলেন না।
২০২৫ সালে সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কণা ও গোলাম মোহাম্মদ ইফতেখারের প্রায় ছয় বছরের দাম্পত্যের ইতি ঘটে। একই বছরের শেষ দিকে বিচ্ছেদের খবর আসে সংগীতশিল্পী মৌসুমী আক্তার সালমার সংসারে। ২০১৮ সালে আইনজীবী সানাউল্লাহ নূর সাগরকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। পরে দুজনই বিচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এ ছাড়া অভিনেতা রাশেদ মামুন অপু ও সংবাদপাঠিকা মমরেনাজ মোমোর বিচ্ছেদের খবরও ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশ্যে আসে। যদিও তাঁদের দাম্পত্যের ইতি আরও কয়েক বছর আগেই ঘটেছিল বলে জানা যায়।
২০২৪ সালেও শোবিজ অঙ্গনে বেশ কয়েকটি আলোচিত বিচ্ছেদের খবর সামনে আসে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি স্বামী রকিব সরকারের সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। ২০২১ সালে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা।
একই বছরের জুলাইয়ে অভিনেতা আরিফিন শুভ ও অর্পিতা সমাদ্দারের প্রায় সাড়ে নয় বছরের দাম্পত্যের ইতি ঘটে। দুজনের পক্ষ থেকেই বিচ্ছেদকে পারস্পরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে জানানো হয়।
এর আগে অভিনেতা শরিফুল রাজ ও পরীমণির সম্পর্কের টানাপোড়েনও ব্যাপক আলোচনায় ছিল। তাঁদের দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার পর সন্তানকে ঘিরে দুজনের যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
এর বাইরেও তাহসান-মিথিলা, নোভা-রায়হান, হাবিব-রেহান, শখ-নিলয়, বাঁধন-সনেট, হৃদয় খান-সুজানা এবং মিলা-পারভেজ সানজারির মতো তারকা জুটির বিচ্ছেদ বিভিন্ন সময়ে ভক্তদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কোনো তারকা জুটির সম্পর্ক ভেঙে গেলে সাধারণ মানুষের একটি অংশ কেন এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন—এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক সাইকোথেরাপিস্ট ক্যাথরিন শেফলার ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন, মানুষ অনেক সময় তারকা জুটিকে একটি ‘নিখুঁত’ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করে। তাঁদের জীবন দেখে ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভালোবাসা ও সাফল্য থাকলে একটি সম্পর্ক সহজেই টিকে থাকে।
কিন্তু সেই তারকা জুটির বিচ্ছেদের খবর সামনে এলে ওই ধারণায় ধাক্কা লাগে। অবচেতনভাবে কারও মনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—সফল, আকর্ষণীয় ও সম্পদশালী মানুষের সম্পর্কও যদি ভেঙে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কতটা নিরাপদ?
শেফলারের মতে, ভালোবাসার পাশাপাশি কার্যকর যোগাযোগ, পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি, আস্থা এবং আর্থিক বিষয়ে বোঝাপড়াও একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তারকা ও ভক্তদের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘প্যারাসোশ্যাল’ বা একপাক্ষিক সম্পর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে তারকার ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্ত এখন ভক্তদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও ব্রেকআপ কোচ ড. আন্দ্রিয়া লাইনারের মতে, তারকারা অনেক সময় মানুষের কাছে সৌন্দর্য, সাফল্য, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকেও অনেকে নিজের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন।
তারকার সম্পর্ক ভেঙে গেলে সেই কল্পিত ‘নিখুঁত জীবনের’ ধারণায় ফাটল ধরে। তখন ভক্তদের মধ্যে বিস্ময়, হতাশা কিংবা নিজেদের সম্পর্ক নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপ দাম্পত্য জীবনের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কর্মব্যস্ততা কিংবা দূরত্বের কারণে অনেক দম্পতির সামনাসামনি কথা বলার সময় কমে যাচ্ছে। ফলে ভালোবাসা থেকে শুরু করে অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি ও ঝগড়ার বড় অংশই কখনো কখনো ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।
ডিজিটাল যোগাযোগের আরেকটি সমস্যা হলো এর দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি। রাগের মুহূর্তে পাঠানো কোনো বার্তা, পুরোনো ছবি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বহুদিন পরও সামনে চলে আসতে পারে। ফলে অতীতের কোনো বিরোধ নতুন করে সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সাজানো ও পরিমার্জিত জীবনের ছবি দেখে নিজের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও তৈরি হয়। বাস্তব জীবনের জটিলতা আড়ালে রেখে কেবল সুন্দর মুহূর্তগুলো প্রকাশ করার ফলে একটি অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
তারকাদের বিচ্ছেদের খবর ভক্তদের জন্য আবেগের হলেও প্রতিটি সম্পর্কের ভেতরের বাস্তবতা বাইরের মানুষ জানেন না। সামাজিক মাধ্যমে দেখা ছবি কিংবা প্রকাশ্য উপস্থিতি দিয়ে কোনো দাম্পত্যের প্রকৃত অবস্থা বিচার করাও সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায়ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ভালোবাসার পাশাপাশি যোগাযোগ, আস্থা, পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তব জীবনের বোঝাপড়ার গুরুত্ব উঠে আসে। তাই কোনো তারকা জুটির বিচ্ছেদকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে মানুষের সম্পর্কের জটিল বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখা যায়।
তারকাদের প্রেম, বিয়ে ও বিচ্ছেদ নিয়ে মানুষের আগ্রহ হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি কৌতূহলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বস্তির বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।