সম্পাদকীয়

চামড়া শিল্পে বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

সিলেটে আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চামড়া শিল্পকে দেশের অন্যতম প্রধান বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে রূপান্তরের যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আড়াই মাসের মাথায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, বন্ধ কলকারখানা সচল করতে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে কাজে লাগানোর এই বার্তা দেশের আগামীর শিল্পায়নের একটি স্পষ্ট রূপরেখা নির্দেশ করে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি বহুমুখীকরণের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। চামড়া খাতকে বিলিয়ন ডলারের শিল্পে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা এই বহুমুখীকরণের পথকে ত্বরান্বিত করবে। কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে এই খাতে মূল্য সংযোজন করার সুযোগ পোশাক খাতের চেয়েও বেশি। মন্ত্রী মহোদয় যে সংস্কার এবং অংশীজনদের সাথে আলোচনার কথা বলেছেন, তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে দেশের চামড়াজাত পণ্যের বড় হিস্যা নিশ্চিত করা সম্ভব।

একই সাথে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে চীন সরকার ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রকাশ করার বিষয়টি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুখবর। এফডিআই বা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের এই জোয়ার যদি গ্রাউন্ড লেভেলে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের কলকারখানাগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া আনবে। এর ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বর্তমান কর্মসংস্থান সংকটের বাজারে অত্যন্ত জরুরি।

বিজ্ঞান মেলার ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করার বিষয়টি দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী করার মাধ্যমেই টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব।

মুখ্যমন্ত্রীর সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিকল্পনা প্রশংসনীয় হলেও এই খাতের বাস্তব চিত্র বেশ জটিল। চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হলো পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স। সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর (বিসিক) কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি বছরের পর বছর ধরে পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশের চামড়া আন্তর্জাতিকভাবে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ এর সনদ পাচ্ছে না। ফলে আমরা কাঁচা চামড়া কম দামে রপ্তানি করতে বাধ্য হচ্ছি। এই পরিবেশগত সংকটের সমাধান না করে কেবল সংস্কারের আশ্বাস দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না।

এছাড়া, সম্পদ সংরক্ষণ ও অপচয় রোধে মন্ত্রীর জনসচেতনতার আহ্বান যৌক্তিক হলেও, কোরবানির ঈদের সময় চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে প্রতি বছর যে অব্যবস্থাপনা এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখা যায়, তা দূর করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পরিকল্পনার কথা এখানে উল্লেখ করা হয়নি। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ এবং লবণজাতকরণের আধুনিক ব্যবস্থার অভাব তৃণমূলের প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের লোকসানের মুখে ফেলে, যার ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ অপচয় হয়।

চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগটি ভালো, তবে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের নীতিগত ধারাবাহিকতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। অতীতের অনেক সমঝোতা স্মারক আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আলোর মুখ দেখেনি।

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীর এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (Action Plan) গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সাভার ট্যানারির পরিবেশগত মান উন্নয়ন করে আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন্ধ কারখানাগুলোতে চীনা বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (One-Stop Service) চালু করা দরকার, যাতে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেন।

পরিশেষে বলা যায়, সরকারের এই আড়াই মাসের পথচলায় বড় আমূল পরিবর্তন সম্ভব না হলেও, খাতের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে পারাটাই ইতিবাচক শুরুর লক্ষণ। দেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে এবং বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সরকারের এই প্রতিশ্রুতির সাথে সুশাসন, দ্রুত বাস্তবায়ন ক্ষমতা এবং পরিবেশগত সুরক্ষার কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে। তবেই চামড়া শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search