সম্পাদকীয়

রামিসা হত্যা ও নারী নির্যাতন নির্মূল: তারেক রহমানের সামনে এসিড দমনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ

একটি শিশু যখন নিজ দেশে, নিজ জনপদে নৃশংসতার শিকার হয়, তখন কেবল একটি জীবন প্রদীপই নেভে না, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোটি ভেঙে পড়ে। শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা ঢাকাকে আজ এক বিশাল প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত করেছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—প্রতিটি নাগরিক আজ একটিই প্রশ্ন তুলছেন: আমাদের কন্যারা, আমাদের শিশুরা কবে এই স্বাধীন ভূখণ্ডে নিরাপদ হবে? এই ক্ষোভ কেবল একটি ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক পুঞ্জীভূত গণ-বিস্ফোরণ।

রামিসার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাতের প্রাক্কালে ডা. জুবায়দা রহমানের মন্তব্যটি শুধু রাজনৈতিক দিক থেকেই নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক দিক থেকেও শতভাগ যুক্তিযুক্ত।

একজন প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ান, তখন তা অনেক সময় রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল বা আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিতে পারে। কিন্তু ডা. জুবায়দা রহমান যখন বলেন, “একজন কন্যা সন্তানের বাবা হিসেবে যেতে হবে”—তখন তিনি মূলত রাষ্ট্রপ্রধানের ভেতরের মানবিক সত্তা এবং পরম সহানুভূতিকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। একজন বাবা যেভাবে তাঁর কন্যার বিপদে বুক দিয়ে আগলে রাখেন, রাষ্ট্রকেও আজ দেশের প্রতিটি কন্যাসন্তানের জন্য সেই ‘পিতা’র মতো পরম আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে হবে।

“তারেক রহমানকে রামিসার বাসায় শুধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গেলে হবে না, একজন কন্যা সন্তানের বাবা হিসেবে যেতে হবে। এসিড নিক্ষেপ দমন করেছিলো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, এবার ধর্ষণ নির্মূল করতে হবে তারেক রহমানকে।” – জুবায়দা রহমান।

২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা মহামারী আকার ধারণ করেছিল। তখন সরকার ‘এসিড অপরাধ দমন আইন’ ‘এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন’ প্রণয়ন করে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং এসিডের অবাধ বিক্রি বন্ধের মাধ্যমে এই অপরাধকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছিল, যা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।

ডা. জুবায়দা রহমান সেই ঐতিহাসিক সফলতার দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মায়ের হাত ধরে যেভাবে এসিড সন্ত্রাস নির্মূল হয়েছিল, পুত্রের হাত ধরে সেভাবেই আজ সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো পিশাচবৃত্তি চিরতরে উপড়ে ফেলতে হবে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি এই সময়ের সবচেয়ে বড় জাতীয় দাবি।

এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রকে বহুমুখী ও কঠোর ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে:

১. বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল
আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোকে আরও গতিশীল করতে হবে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোকে ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ড) নিশ্চিত এবং তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

২. তদন্ত ও সাক্ষ্য সুরক্ষা আইনের আধুনিকায়ন
অনেক সময় দুর্বল তদন্ত বা ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর আসামিপক্ষের হুমকির কারণে অপরাধীরা খালাস পেয়ে যায়। তাই পুলিশি তদন্ত ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং আধুনিক ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। পাশাপাশি, মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ‘সাক্ষী’দের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ (Witness Protection Act) দ্রুত পাস করতে হবে।

৩. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্রয়ের অবসান
বিগত দিনগুলোতে দেখা গেছে, অনেক প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ করেও পার পেয়ে গেছে। বর্তমান সরকারকে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণ করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার অপরাধের পরিচয়ই যেন শেষ পরিচয় হয়—প্রশাসনিকভাবে এই কঠোর বার্তা দিতে হবে।

৪. শিক্ষা কারিকুলাম ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন
কেবল আইন দিয়ে অপরাধ দমন সম্ভব নয়, যদি না মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে জেন্ডার সমতা, নারীর প্রতি সম্মান এবং নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে, পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার এবং মাদকের অপব্যবহার রোধে কঠোর সাইবার ও সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে, যা এই ধরনের অপরাধের অন্যতম প্রধান অনুঘটক।

৫. সামাজিক প্রতিরোধ ও মনিটরিং সেল
স্থানীয় পর্যায়ে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্ষদে ‘নারী ও শিশু সুরক্ষা কমিটি’ গঠন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় শিক্ষক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও নারী নেত্রীরা থাকবেন। কোনো এলাকায় ইভটিজিং বা নির্যাতনের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলেই এই কমিটি দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেবে।

আজ ঢাকার রাজপথে যে স্লোগান অনুরণিত হচ্ছে, তা আসলে একটি নিরাপদ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের আকুতি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে এসিড সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জয়ী হয়েছিলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সেই একই রকম আপসহীন ও বজ্রকঠিন ভূমিকা নিতে হবে।

ডা. জুবায়দা রহমানের আহ্বানকে ধারণ করে রাষ্ট্রপ্রধান যদি একজন ‘পিতা’র হৃদয় নিয়ে এই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেন, তবেই দেশের শাসন ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। রামিসার রক্ত যেন বৃথা না যায়; তার আত্মত্যাগ যেন বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী ও শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এক চূড়ান্ত বাঁক বদল বা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, নব দিগন্তের সূচনা ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ, শুভেচ্ছা জ্ঞাপন এবং সংবিধান অনুযায়ী সুশাসন ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে শুভকামনা ও প্রত্যাশার সম্পাদকীয়।

রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

স্বাস্থ্যগত কারণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ, স্পিকারের প্রত্যাবর্তন এবং সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাইলস্টোন ট্রাজেডির এক বছর, বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় সুরক্ষার শিক্ষা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মাইলস্টোন ট্রাজেডির এক বছর পূর্তিতে তারেক রহমান ও জুবায়দা রহমানের উক্তি বিশ্লেষণ এবং অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নে করণীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

ফ্যামিলি কার্ডের দেশব্যাপী সম্প্রসারণ ও স্বচ্ছ ডেটাবেজ তৈরীতে গুরুত্ব দিতে হবে : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণের উদ্যোগ ও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসান কমানো ও টেকসই উন্নয়নের রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৮৮৯ কোটি টাকা লোকসানের কারণ বিশ্লেষণ এবং রেলের আয় বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

শব্দ ও বায়ু দূষণের মহাবিপর্যয় রোধে চাই সমন্বিত মহাপরিকল্পনা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকা শহরের ভয়াবহ শব্দ ও বায়ু দূষণের বর্তমান পরিমাণ, পেছনের প্রধান কারণসমূহ এবং এই মহাবিপর্যয় রোধে কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন তা নিয়ে বিস্তারিত সম্পাদকীয়।

দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ও পরিকল্পিত রোডম্যাপ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭ লাখ মানুষের পুনর্বাসন ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার প্রতিরোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমাদের প্রত্যাশা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিং। আরবি হরফ লেখা পতাকা, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ ও শহীদদের তালিকা নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search