বরিশালে ২,৫৮৯ মাদকবিরোধী অভিযান, আইনের আওতায় ৯১৭ জন
মো:জিয়াউদ্দিন বাবু। বরিশাল : বরিশালে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত…
নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় এবং যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হলো চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৫ জুন, ২০২৬) বিকেলে বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক ও ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই দেশের সরকার প্রধানের উপস্থিতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সবুজ উন্নয়ন (গ্রিন ডেভেলপমেন্ট), কারিগরি শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতার লক্ষ্যে মোট ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব দলিলে সই করেন। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বেইজিংয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই সফরের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
এর আগে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রাসহকারে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তাঁকে উষ্ণ ও রাজকীয় অভ্যর্থনা জানান। বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধানের সম্মানে তোপধ্বনি দেওয়া হয় এবং চীনের সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালাম প্রদান করে।
দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর দুই প্রধানমন্ত্রী প্যারেড পরিদর্শন করেন। চীনের মতো একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া এই নজিরবিহীন সম্মাননা ও প্রোটোকল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন অত্যন্ত চমৎকারভাবে গণমাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন।
চীনে স্বাক্ষরিত এই ১৩টি সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকরী ও সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখবে।
চীনের বিনিয়োগ সহযোগিতার মাধ্যমে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে ‘গ্রিন ডেভেলপমেন্ট’ বা সবুজ উন্নয়নসংক্রান্ত চুক্তিটি বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আধুনিক চীনা প্রযুক্তি স্থানান্তরে সাহায্য করবে।
চীনের এই বৈশ্বিক উদ্যোগের অধীনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনগণের দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো গতি পাবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান ও কারিগরি-ভোকেশনাল শিক্ষার দুটি সমঝোতা স্মারক দেশের বেকার যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করবে, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে জাতীয় ফল কাঁঠাল চীনে রপ্তানির বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। চীনের মতো বিশাল বাজারে বাংলাদেশি ফল ও কৃষিপণ্যের এই প্রবেশাধিকার দেশের প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করবে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে।
গণমাধ্যম খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও তথ্য আদান-প্রদানে স্বাক্ষরিত চারটি চুক্তি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং গণমাধ্যমের আধুনিকায়নে বড় অবদান রাখবে।
ভূ-রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উত্থাপিত রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকার সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিয়েছে। মিয়ানমারের ওপর চীনের যে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই মালয়েশিয়া ও চীনের মতো দুই প্রভাবশালী এশীয় পরাশক্তি থেকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে এত বড় কূটনৈতিক বিজয় ছিনিয়ে আনা নিঃসন্দেহে তারেক রহমান সরকারের এক বিরাট রাজনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য।
বিগত দিনে একমুখী ও পরনির্ভরশীল কূটনীতির কারণে দেশ যে ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পড়েছিল, তারেক রহমান সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তা কাটিয়ে উঠে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত যথার্থই বলেছেন, চীন সরকার বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি তাদের নিঃশর্ত ও সম্পূর্ণ সমর্থনের কথা স্পষ্ট ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছে। বেইজিং বর্তমান সরকারের সঙ্গে ট্রেড, এডুকেশন ও কালচারসহ সব বিষয়ে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চীনের এই প্রকাশ্য অবস্থান প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছে। বেইজিংয়ের এই সফর কেবল একটি নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় সফর নয়; এটি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ‘সোনালি ৫০ বছর’-এ প্রবেশের মুখে এক নতুন যুগের শুভসূচনা।
তারেক রহমান সরকারের এই দূরদর্শী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে এবং একটি আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐতিহাসিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।