সম্পাদকীয়

বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা চালুর উদ্যোগ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে নতুন আশার আলো

সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খাত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বিগত কয়েক দশকে ভুল নীতি, লাগামহীন অব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং আধুনিকায়নের অভাবের কারণে বাংলাদেশের বহু রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা লোকসানের বোঝায় পরিণত হয়ে একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে গেছে।

বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ, জমি ও অবকাঠামো এভাবে বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় অপচয়। এই স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাগুলো দেশি-বিদেশি যৌথ বা বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে পুনরায় সচল করার যে নীতিগত সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার নিয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শী।

গত শনিবার (৪ জুলাই, ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পুরো প্রক্রিয়াটি অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ এড়িয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা দেশের শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী আইনি ও প্রশাসনিক গতিবেগ সঞ্চার করবে।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানিয়েছেন যে, ইতিমধ্যে বন্ধ থাকা এই কলকারখানাগুলোতে বিনিয়োগ করতে দেশি-বিদেশি অনেক বড় বড় বেসরকারি কোম্পানি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং নতুন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের দেওয়া এই প্রস্তাবগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এখন দ্রুত শুরু হওয়া দরকার।

বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই বিশাল মৃত সম্পদকে সচল সম্পদ হিসেবে রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কলকারখানা পুনরায় চালু করা কেবল সরকারের লোকসান কমানোর বিষয় নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভাগ্য।

পাট, বস্ত্র, চিনি ও রাসায়নিক খাতের মতো বড় বড় রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো যখন বন্ধ হয়েছিল, তখন হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী রাতারাতি বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন শুরু করেছিলেন। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এই কারখানাগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে সচল করা হলে পুরাতন শ্রমিকদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি দেশের লাখ লাখ কারিগরি ও সাধারণ বেকার যুবকের জন্য নতুন ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাগুলোর বেশিরভাগই ঢাকার বাইরে মফস্বল বা গ্রামীণ অঞ্চলে অবস্থিত। এই কারখানাগুলো চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন খাত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে, যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা গতিশীল করবে এবং ঢাকামুখী মানুষের উপচে পড়া অভিবাসন হ্রাস করবে।

নতুন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কারখানাগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে গুণগত পণ্য উৎপাদিত হলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ‘আমদানি বিকল্প’  হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে দেশের আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদিত উদ্বৃত্ত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

তবে এই পুরো মহতী প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে প্রধানমন্ত্রী যে ‘স্বচ্ছতার’ ওপর জোর দিয়েছেন, তা শতভাগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি বেসরকারীকরণের নামে নামমাত্র মূল্যে দলীয় বা বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর কাছে লিজ বা বিক্রি করে দেওয়ার যে ক্ষতিকর প্রবণতা দেখা গেছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন এবার না হয়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও আর্থিকভাবে সক্ষম কোম্পানিকে নির্বাচন করতে হবে।

চুক্তিপত্রে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহারের শর্তগুলো কঠোরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। আমরা আশা করি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়াল ভেঙে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই কলকারখানাগুলোর চিমনি দিয়ে আবারও ধোঁয়া উড়বে, যা হবে নতুন বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লব ও স্বনির্ভরতার প্রতীক।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search