সম্পাদকীয়

‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ করুণা নয়, রাষ্ট্রের দায় মেটানোর যুগান্তকারী ইশতেহার : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

একটি প্রকৃত কল্যাণকামী, আধুনিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের মূল ভিত্তি হলো নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ করে ২০২৬ সালের নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যে আমূল সংস্কার শুরু হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান মাইলফলক অর্জিত হলো চলতি বাজেট অধিবেশনে।

গত বুধবার (১৫ জুলাই, ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং প্রথম বাজেট সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও নাগরিক সেবাকে একটি বৈপ্লবিক কাঠামোর আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী জানান, আলাদা আলাদাভাবে চলমান কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসী কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানী কার্ডসহ বিভিন্ন সেবার জন্য ব্যবহৃত সকল কার্ডকে পর্যায়ক্রমে একীভূত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ নামে একটি মাত্র সমন্বিত কার্ড চালু করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী রাজনৈতিক দর্শন এবং ডিজিটাল ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার উদ্যোগ দেশের জনজীবন উন্নয়নে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এক অভূতপূর্ব ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।

এই বাজেট সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে রাজনৈতিক ও দার্শনিক বার্তাটি দিয়েছেন, তা সমসাময়িক বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এই সকল সুবিধা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের করুণা নয়; বরং এগুলো জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দায়।”

বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় আমরা দেখেছি, কীভাবে জনগণের করের টাকায় দেওয়া সরকারি ভাতাকে একশ্রেণীর শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ব্যক্তিগত বা দলীয় ‘দয়া’ ও ‘করুণা’ হিসেবে প্রচার করত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেই দাসত্বমূলক মানসিকতার দেয়ালে কুঠারাঘাত করে নাগরিকদের তাদের প্রকৃত অধিকারের মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের প্রতি তার এই ন্যূনতম দায় মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে যে রাষ্ট্র এবং জনগণ উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে—এই সত্যটি অনুধাবন করা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও টেকসই সরকার ব্যবস্থার লক্ষণ।

দেশব্যাপী এই একটি মাত্র সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ প্রবর্তন করা হলে তা দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্তরে এক নীরব বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

বর্তমানে একজন নাগরিককে কৃষকের ভরতুকি, ফ্যামিলি কার্ডের রেশন, কিংবা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বোনাস ও ইমামদের সম্মানী পেতে ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরে দৌড়াতে হয় এবং আলাদা কার্ডের জন্য অন্তহীন আমলাতান্ত্রিক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সব সেবা এক কার্ডে চলে আসলে এই দীর্ঘসূত্রতা ও সাধারণ মানুষের সময়-শ্রমের অপচয় সম্পূর্ণ বন্ধ হবে।

একাধিক কার্ড থাকার কারণে অতীতে ডেটাবেজের ত্রুটির সুযোগ নিয়ে ভুয়া কার্ড তৈরি, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা ভোগ করা কিংবা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেওয়ার ভূরি ভূরি অভিযোগ ছিল। ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ একটি সেন্ট্রাল ন্যাশনাল ডেটাবেজের সাথে যুক্ত থাকায় জালিয়াতির সুযোগ থাকবে না এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ সরাসরি প্রকৃত হকদারের পকেটে পৌঁছাবে।

কৃষক, ইমাম, রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এই একক কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হবে। কার্ডের সাথে সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং যুক্ত থাকায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ দ্রুত ও নিরাপদ হবে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী ও সাম্যবাদী পরিকল্পনাটির সফল বাস্তবায়ন এক বিশাল প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।

১ কোটি ২০ লাখের বেশি প্রাথমিক শিক্ষার্থীর ড্রেস-ব্যাগের তহবিল বণ্টন কিংবা দেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের জন্য এই ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ নিখুঁতভাবে তৈরি করতে হলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, সুরক্ষিত এবং হ্যাকিং-মুক্ত আইটি অবকাঠামো প্রয়োজন। ডাটা এন্ট্রির সময় মাঠপর্যায়ে যেন কোনো অসাধু চক্র প্রকৃত দরিদ্র বা কৃষকদের বাদ দিয়ে কোনো স্বজনপ্রীতি করতে না পারে, সেজন্য কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ১৫ জুলাই ২০২৬-এর এই বাজেট সমাপনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘আমি নয় আমরা’ এবং ‘জনগণই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য’—এই যে জনমুখী রাজনৈতিক ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, তা যদি মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত হয়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হবে চব্বিশের বিপ্লবের শহীদদের আকাঙ্ক্ষার এক প্রকৃত বাস্তবায়ন।

এই ইউনিভার্সাল কার্ডের হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি স্বনির্ভর, বৈষম্যহীন, আধুনিক ও মানবিক ডিজিটাল মডেল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশীয় সার কারখানায় গ্যাস-সংকট, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয়।

জীবনকালীন ভোগাধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পিতা-মাতার ভোগাধিকার রক্ষা করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস এবং শরিয়াহ বিষয়ক বিতর্কের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকটে শত শত গাড়ির লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের চার বিভাগীয় লংমার্চের যৌক্তিকতা এবং চলমান জ্বালানি সংকটে সম্পদ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বৈচিত্র্যময় শিল্প, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অর্থায়নের নতুন পথরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইএসডিবির অর্থায়ন চুক্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্য মতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম ও সমাধানের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী -ঐতিহ্য, সংহত অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের রূপরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় উন্নয়ন, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search