স্বাস্থ্যগত কারণ দর্শিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গভবনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং এই খবরের পরপরই চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে থাকা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি দেশে ফেরার নির্দেশ—সব মিলিয়ে ঘটনাপ্রবাহ এক বড় ধরনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংবিধানের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের রূপান্তর নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
সাংবিধানিক ধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবকের দায়িত্ব হস্তান্তর যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য ও শক্তির পরিচায়ক।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমেই কেবল রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। একই সাথে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে দেয় যে—রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করবেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দ্রুত দেশে প্রত্যাবর্তন সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণের সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতিকেই তুলে ধরে।
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই সময়কালটি বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংকটময় ও জটিল ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে শুরু করে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথগ্রহণ, এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক বিএনপি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর—প্রতিটি ঐতিহাসিক মোড়ে সংবিধান রক্ষায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
শারীরিক জটিলতা, বিশেষ করে তাঁর অতীতে ঘটে যাওয়া কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারির ধারাবাহিকতায় চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা একটি মানবিক বিষয়। দায়িত্ব ছাড়ার পর চিকিৎসার জন্য তাঁর বিদেশে গমন কিংবা দেশে থাকা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে একটি সম্মানজনক বিদায় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করাই যুক্তিযুক্ত।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—সংবিধানের ১২৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। বিএনপি সরকারের অধীনে এই প্রক্রিয়াটি কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং সর্বজনগ্রাহ্যভাবে সম্পন্ন হয়, সেদিকেই দেশবাসী তথা আন্তর্জাতিক মহল তাকিয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই আসনটিতে এমন এক ব্যক্তিত্বকে অধিষ্ঠিত করা প্রয়োজন যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, গণতন্ত্র ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় ও নিবেদিত ভূমিকা পালন করতে পারবেন। আইন ও সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এই পদত্যাগ ও পরবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হলে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।